পবিত্র কুরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক মৌলভী আমির উদ্দীন বসুনিয়া

মাওঃ মোঃ মোশাররফ হোসাইন:
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আশা করি সবাই ভালোভাবে ইসলামী আর্টিকেলগুলো পড়ে ভালো কিছু উপলব্ধি করেছেন। আজ এমন একটি বিষয়ে আর্টিকেল লেখা শুরু করলাম যা আমাদের জানা একান্ত আবশ্যক। মহা গ্রন্থ আল কোরআন সর্ব প্রথম কোন সাধক বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। আর অনুবাদ বা ভাষান্তর এমনিতেই একটি দুরূহ কাজ। আল কোরআনের মতো একটি আসমানী গ্রন্থের ব্যাপারে জটিলতার সঙ্গে স্পর্শকাতরতার বিষয়ও জড়িত। মানব রচিত গ্রন্থের বেলায় বক্তার কথার হুবহু ভাষান্তর না হলে তেমন কি-ই বা আসে যায়। বড় জোর বলা যায় অনুবাদক মূল লেখকের কথাটার সঙ্গে যথাযথ ইনসাফ করতে পারেন নি। কিন্তু আল-কোরআনের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে অনুবাদের একটু হেরফের হলে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলার কথাই বিতর্কিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এসব কারণেই মুসলমানদের মাঝে কেউই এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আল-কোরআনের অনুবাদের ঝুঁকি নিতে চায় নি।
এমনকি বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার আলেমরা ফতোয়ার মাধ্যমে তাতারি ভাষায় আল-কোরআনের যাবতীয় অনুবাদ প্রচেষ্টাকে বন্ধ করে রাখেন। আফ্রিকা মহাদেশে বিশষ করে নাইজেরিয়া ও নাইজারে হাউসা হচ্ছে আরবির পর সর্বাধিক সমৃদ্ধ ভাষা। এ ভাষায় আলেমরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাদের ভাষায় আল-কোরআনের অনুবাদকে এ বলে বন্ধ করে রাখেন যে, এতে আল-কোরআনের মর্যাদাহানি হতে পারে। এ মহাদেশের ক্যামেরুন রাজ্যের সুলতান সাঈদ নিজেও আলেমদের প্রবল বিরোধিতার কারণে বামুম ভাষায় কোরআনের অনুবাদ কাজ থেকে ফিরে আসেন। মুসলিম দুনিয়ার অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া বোর্ডও তো এ সেদিন পর্যন্ত আল-কোরআনের যাবতীয় অনুবাদকর্মের বিরোধিতা করে আসছিলো।
তারা ১৯২৬ সালে তুরস্কে উসমানী খেলাফত বিলুপ্তির পর তুর্কী ভাষায় আল-কোরআনের অনুবাদ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন। কোরআনের ইংরেজি অনুবাদক নওমুসলিম মার্মডিউক পিকথল যখন কোরআনের অনুবাদ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তখন হায়দারাবাদের শাসক নিজাম তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিলেও আল আযহার কর্তৃপক্ষ এ উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেন। অবশ্য দীর্ঘদিন পর হলেও মক্কাভিত্তিক মুসলিম সংস্থা রাবেতা আলামে ইসলামী আয়োজিত বিশ্বের সর্বমতের উলামা কোরআন অনুবাদের একটি ঘোষণাপত্রে সই করে এ পথের যাবতীয় বাধা অপসারণ করেন। কিন্তু এটা তো ১৯১৮ সালের কথা, মাত্র সেদিনের ঘটনা। অবশ্য এরও বহু আগে ইংরেজ লেখক জর্জ সেল কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। ১৭৩৪ সালে এ অনুবাদ কর্মটির প্রথম খ- প্রকাশিত হয়। ১৭৬৪ সালে তার পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ মুদ্রিত হয়। ১৮২৫ সালে এটি পুনঃমুদ্রিত হয়।
যেমনটি আমি একটু আগেও বলে এসেছি যে, কোরআনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাবো, কোরআন অনুবাদের এ মোবারক ধারাটি স্বয়ং তাঁর হাতেই সূচিত হয়েছে যার ওপর এ কোরআন নাযিল হয়েছে। আমরা জানি, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দাওয়াতী আন্দোলনের এক পর্যায়ে তৎকালীন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দূত পাঠাতেন। তাঁর পাঠানো এসব চিঠিতে অবশ্যই একাধিক কোরআনের আয়াত লেখা থাকতো। যেসব দেশের রাজা বাদশাহরা আরবী বুঝতেন না রাসূলের দূত তাদের কাছে গোটা চিঠির সঙ্গে সেসব আয়াতের তরজমাও পেশ করতেন। এ কারণেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দূতকে যে দেশে পাঠাতেন তাকে আগেই সে দেশের ভাষা শিখতে বলতেন। অধিকাংশ নতুন এলাকায় তিনি পারদর্শী দোভাষীও পাঠাতেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ বলেন, যে প্রিয়নবী তার ব্যক্তিগত সহকারী ওহী লেখক যায়েদ ইবন ছাবিত রাদিআল্লাহু আনহুকে সিরিয়ান ও হিব্রু ভাষা শেখার আদেশ দিয়েছিলেন। তাছাড়া আমীর ইবন উমাইয়া যে আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাসীর কাছে লেখা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরবী চিঠিকে আমহারিক ভাষায় অনুবাদ করেছেন তারও একাধিক প্রমাণ ইতিহাস গ্রন্থে মজুদ রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় কোরআনের এসব আংশিক অনুবাদ ছিলো অনেকটা মুখে মুখে। কোথায়ও লিখিত আকারে এগুলোকে কোরআনের আয়াতের অনুবাদ হিসেবে কেউ সংরক্ষণ করেন নি। পরবর্তী সময়ে যখন কোরআনের বাণী নিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উৎসর্গিত প্রাণ সাহাবীরা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়লেন তখন এর প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে দেখা দিলো। কোরআনের বিষয়বস্তু ও ভাষাশৈলীর স্পর্শকাতরতার কারণে কোরআনের গবেষকরা প্রথম দিকে নানা আপত্তি উত্থাপন করলেও শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষায় কোরআন অনুদিত হতে শুরু করলো। এভাবেই কোরআনের আবেদন মূল আরবী ভাষার পরিম-ল ছাড়িয়ে বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে পড়লো।
বাইরের পরিম-লে এসে সম্ভবত ফার্সী ভাষায়ই সর্বপ্রথম কোরআন অনূদিত হয়েছে। প্রিয় নবীর ইন্তিকালের প্রায় ৩৫০ বছর পর ইরানের সাসানী বাদশা আবু সালেহ মানসুর ইবন নূহ কোরআনের পূর্ণাঙ্গ ফার্সী অনুবাদ করেন। কোরআনের ফার্সী অনুবাদের এ বিরল কাজের পাশাপাশি তিনি মুসলিম ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ তাফসীর প্রন্থ ইমাম মুহাম্মদ ইবন জারীর আত-তাবারীর ৪০ খ-ে সমাপ্ত বিশাল আরবী ‘তাফসীর জামেউল বয়ান আত-তাওয়ীলূল কোরআন’-এর ফার্সী অনুবাদ করেন। আমাদের এ ভারতীয় উপমহাদেশে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী কোরআনের যে ফার্সী ভাষান্তর করেছিলেন তা ছিলো আরো ৮০০ বছর পরের ঘটনা। প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ১৭৭৬ সালে শাহ রফিউদ্দীন ও ১৭৮০ সালে শাহ আবদুল কাদের কোরআনের উর্দূ অনুবাদ করেন।
বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের কাজটি আসলেই অনেক দেরিতে শুরু হয়েছে। এর পেছনে কারণও ছিলো অনেক। প্রথমত আমাদের এ ভূখ-ে যারা কোরআনের ইলমের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন সেসব কোরআন সাধকদের অনেকেরই কোরআন শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ছিলো ভারতের উর্দু প্রধান এলাকার ঐতিহ্যবাহী দীনী প্রতিষ্ঠান দেওবন্দ, সাহারানপুর, নদওয়া, জামেয়াতুল ইসলাহ, জামেয়াতুল ফালাহসহ উর্দু ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর সব কয়টির ভাষাই ছিলো উর্দু কিংবা ফার্সী, তাই স্বাভাবিকভাবেই এসব দিনি প্রতিষ্ঠান থেকে যারা উচ্চতর সনদ নিয়ে বের হন তাদের কোরআন গবেষণার পরিম-লও সে ভাষার বাইরে ছড়াতে পারে নি।
দ্বিতীয়ত পলাশীর ট্রাজেডির ফলে আমাদের এ অঞ্চলে কোরআন গবেষণার কাজটি নানারকম পঙ্গুত্বের কারণে একরকম দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলো। ফলে বাংলা আসামে কোরআনের আশানুরূপ কোনো অনুবাদই হয় নি। তৃতীয় কারণ হিসেবে বাংলা মুদ্রন যন্ত্রের কথা উল্লেখ করতে হয়। ১৭৭৭ সালে মুদ্রনযন্ত্র আবিষ্কার হলেও এ অঞ্চলের মুসলমানরা ১৮১৫ সালের আগে বাংলা মুদ্রনযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হবার কোনো সুযোগই পান নি।
কে প্রথম বাংলায় পবিত্র কোরআন অনুবাদ করেছেন ?
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ লিখেন, ‘কে প্রথম কোরআনের বাংলা অনুবাদের সৌভাগ্যজনক এ কাজটি শুরু করেন তা নিয়ে আমাদের মাঝে বিভ্রান্তির অন্ত নাই। কে বা কারা আমাদের সমাজে এ কথাটা চালু করে দিয়েছে যে, ব্রাহ্মণ ধর্মের নব বিধান ম-লীর নিষ্ঠাবান ধর্মপ্রচারক গিরিশ চন্দ্র সেন সর্ব প্রথম কোরআনের বাংলা অনুবাদ করেছেন। আসলে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে যাদের সর্বময় আধিপত্য বিরাজমান তারাই যে কথাটা ছড়িয়ে তাতে সন্দেহ নেই। দুঃখ লাগে যখন দেখি আমাদের এ অঞ্চলের দু’একজন কোরআনের মুদ্রাকর ও প্রকাশকও তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ঐতিহাসিকভাবে অসমর্থিত এমনি একটি কথা অবাধে প্রচার করে চলেছেন। অথচ কোরআন ও কোরআনের শিক্ষার প্রতিটি ছাত্রই জানেন যে তার অনুবাদের পাতায় কোরআনের শিক্ষা সৌন্দর্য বাকধারার সঙ্গে ব্রাহ্মবাদের প্রচারনীতিতে কোরআনের প্রতি ক্ষমাহীন বিদ্বেষ ছড়ানো রয়েছে।
গিরিশচন্দ্র সেনের ৬ বছর আগে অর্থাৎ ১৭৮৯ সালে আরেকজন অমুসলিম রাজেন্দ্রলাল মিত্র কোরআনের প্রথম পারার অনুবাদ করেন। কলকাতার আয়ুর্বেদ প্রেস নামক একটি ছাপাখানা থেকে এক ফর্মার (১৬ পৃষ্ঠা) এ অনুবাদটি ৫০০ কপি ছাপা হয়েছিলো।
১৮৮৫ সালে গিরিশচন্দ্র সেনের এ অনুবাদের প্রায় ৮০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮০৮ সালে পূর্ব বাংলার রংপুর নিবাসী একজন সাধারণ কুরআনপ্রেমী মাওলানা আমিরুদ্দীন বসুনিয়া কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদের কাজে হাত দেন। তিনি সে সময় কোরআনের আমপারার অনুবাদ সম্পন্ন করেন। এ ঐতিহাসিক তথ্যের সমর্থন রয়েছে ঢাকা ও কলকাতার প্রায় সব ক’জন কোরআন গবেষকের লেখায়। উভয় বাংলার প্রায় সব ক’টি কোরআন গবেষণা সংস্থা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানই এ ব্যাপারে একমত যে, মওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়াই সে সৌভাগ্যবান মানুষ যিনি বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের এ মহান কাজটির শুভ সূচনা করেন।
গত এক দশকে আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের ইতিহাসের ওপর যেসব পিএইচডি থিসিস লেখা হয়েছে তাতেও এ তথ্য সমভাবে সমর্থিত হয়েছে। ১৮১৫ সালে বাংলা মুদ্রন যন্ত্রের ব্যবহারের পরপর কলকাতার মীর্জাপুরের পাঠোয়ার বাগানের অধিবাসী আকবর আলী এ কাজে এগিয়ে আসেন। তিনিও মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়ার মতো শুধু আমপারা ও সূরা ফাতেহার বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন তার অনূদিত অংশটি ছিলো পুথির মতো। তার এ অনুবাদটি কোরআনের কোনো মৌলিক অনুবাদও ছিলো না। তিনি যেটা করেছেন তা ছিলো ১৭৮০ সালে অনূদিত শাহ আবদুল কাদেরের উর্দূ অনুবাদের বাংলা। সরাসরি কোরআনের অনুবাদ নয় বলে সুধী মহলে এটা তেমন একটা স্বীকৃতি লাভ করে নি। আসলে ব্যক্তি যতো গুরুত্বপূর্ণ হোন না কেন তিনি যদি কুরআনকে কোরআন থেকে অনুবাদ না করেন তাহলে তাকে কখনো কোরআনের অনুবাদ বলে চালিয়ে দেয়া উচিত নয়।’
এ ব্যাপারে মাসিক আল-হুদা নামক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নিবন্ধে এক নিবন্ধকার লিখেন, ‘অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাওলানা আমীর উদ্দীন বসুনিয়া ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ বাংলা ১২১৫ অব্দে তিনি প্রথম আমপারার তরজমা প্রকাশ করেন। যার আকার ছিল ডিমাই ১২ পেইজ ১৬৮ পৃষ্ঠা। অথচ আমাদের দেশে এ তথ্য আবিষ্কারের অভাবে গিরিশচন্দ্র সেনকে (১৮৩৫-১৯১০) কোরআনের প্রথম অনুবাদক বলা হয়। কিন্তু গিরিশচন্দ্র সেনের আগে রাজেন্দ্রনাথ মিত্র কোরআনের অনুবাদ করেন ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মার্চ। গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে এবং সমাপ্ত হয় ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে। রাজেন্দ্রনাথ মিত্রের অনুবাদ পূর্ণাঙ্গ ছিল না। তার অনুবাদ ছিল কয়েক খ-।
১৮৮৩ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়া থেকে মৌলভি নঈমুদ্দিন (১৮৩২-১৯০৮) আকবারে ইসলামিয়া নামে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন, আর এ পত্রিকার মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কার দূর ও আল-কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করতে থাকেন। তার অনূদিত কোরআন শরীফের ১০ পারা পর্যন্ত অনুবাদ সমাপ্ত করে তিনি ইন্তেকাল করেন ১৯০৮ সালের ২৩ নভেম্বর। আকবারে ইসলামিয়া ১৮৮৩ সাল থেকে ১৮৯৩ পর্যন্ত চলছিল। বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সম্পাদক শেখ আবদুর রহীম (১৮৫৯-১৮৩১) তৎকালে টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত আকবারে ইসলামিয়া ও মৌলভি নঈমুদ্দিনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
কবি আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) তার সুশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন বাঙালি মুসলমানের মধ্যে সর্বপ্রথম মৌলভি নঈমুদ্দিন কোরআন মাজীদের বঙ্গানুবাদ করেন। তিনি ১০ পারা পর্যন্ত অনুবাদ করেন এবং মুদ্রন শেষ হওয়ার আগেই ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর লোকান্তরিত হন। কবি আবদুল কাদির তার গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে লিখেন ‘সমগ্র কোরআনের বঙ্গানুবাদ করেন মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম মাওলানা মোহাম্মদ আব্বাস আলী (১৮৫৯-১৯৩২) কলকাতা ৩৩ নম্বর বেনেপুকুর রোড, আলতাফি প্রেসে মুন্সি করিম বকসের দ্বারা মুদ্রিত ১৩১৬ বাংলা সন। আমপারা পর্যন্ত ৩০ পারার অনুবাদ। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৭৬। মূল আরবি পাঠের নিচে উর্দু তরজমা এবং তার নিচে বাংলা অনুবাদ।
বর্ডারের দুই পাশে উর্দু তাফসীর ও বাংলা টীকা দেয়া হয়েছে। অতপর ওই তাফসিরের শেষে অনুবাদক যা বলেছেন তার উদ্ধৃতি, ‘ইসলামের মূল ধর্মগ্রন্থ অমৃতময় কুরআন আলেমরা ফার্সি, উর্দু ইত্যাদি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের বোধগম্য সরল বাংলা ভাষায় কোনো অনুবাদ অদ্যাবধি পরিদৃষ্ট হয় নি। তাদের শ্রুতিমধুর কোরআনের বাক্য সুধাপানে বঞ্চিত ছিল। তাদের সেই অভাব বিমোচনের জন্য এ অনুবাদ প্রকাশিত হলো।’
অতঃপর পঞ্চম অধ্যায়ে এনেছেন খান বাহাদুর মৌলভি তসলীমউদ্দিন আহমদের (১৮৫২-১৯২৭) অনূদিত তাফসিরের কথা। তার অনূদিত কোরআনের প্রথম খ- (প্রথম ১০ পারা) প্রকাশিত হয় ১৩২৯ বঙ্গাব্দে তথা ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে এবং দ্বিতীয় খ- প্রকাশিত হয় ১৩৩০ বঙ্গাব্দে বা ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে (দ্বিতীয় ১০ পারা) এবং তৃতীয় খ- বা শেষ খ- প্রকাশিত হয় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম খ- ছিল ৪৫৮ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় খ- ৪৫৮ পৃষ্ঠা এবং তৃতীয় খ- ৫২১ পৃষ্ঠা। এ অনুবাদে মূল আরবি দেয়া ছিল না, কিন্তু আয়াত ও রুকু নম্বর দেয়া ছিল। ষষ্ঠ অধ্যায়ে তিনি তাদের সবার নামোল্লেখ করেছেন যারা আল-কোরআনের পরবর্তী অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন। মৌলভি আবদুল হাকিম ও আলী হাছান ১৯৩৮ খিস্টাব্দে পূর্ণাঙ্গ কোরআনের অনুবাদ করেন। মৌলভি নকীবুদ্দিন খাঁর (১৮৯০-১৯৭৮) অনুবাদ ৩০ পারা ৩০ খ-ে ছিল। মাওলানা মোঃ রুহুল আমীন, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মৌলভি এয়ার আহমদ, মৌলভি মোঃ তৈমুর, ফজলুর রহিম চৌধুরী, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ডক্টর কুদরত-এ-খুদা, অধ্যাপক আবুল ফজল প্রমুখ কোরআনের অংশ বিশেষের অনুবাদ করেন। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে কবি নজরুল কাব্যে আমপারা প্রণয়ন করেন।
কোরআনের বহুবিধ অনুবাদ ও তাফসির সম্বন্ধে বিশেষ আলোচনা-পর্যালোচনা ও গবেষণা সাহিত্য যিনি প্রকাশ করেন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক ডিন ড. মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান। তার অভিসন্দভের্র বিষয় ছিল ‘বাংলা ভাষায় কোরআন চর্চা’ এ গ্রন্থে তার গবেষণালব্ধ তথ্যে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের পথিকৃৎ বসুনিয়া’ বাক্যটি থেকেই অনুমিত হয় যে তিনিও তার প্রাপ্ত তথ্যে মাওলানা আমীরউদ্দিন বসুনিয়ার প্রথম বঙ্গানুবাদের তথ্য পেয়েছেন।’
কোরআনের প্রথম অনুবাদক মওলানা আমীরুদ্দিন বসুনিয়া কোরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করে যেতে পারেন নি। পরবর্তী সময়ে গিরিশচন্ত্র সেনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদকর্ম যা তখন বাজারে প্রচারিত ছিলো তাও ছিলো নানা দোষে দুষ্ট, তাই তার অনুবাদের মাত্র ২ বছরের মাথায়ই কোরআনের বিশ্বস্ত ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদকর্ম নিয়ে হাজির হয়েছেন বিখ্যাত কোরআন গবেষক মাওলানা নায়ীমুদ্দীন। এর আগে কলকাতার একজন ইংরেজ পাদ্রীও কোরআনের অনুবাদ করেছিলেন। শোনা যায় মাওলানা আমিরুদ্দীন বসুনিয়া থেকে গিরিশচন্দ্র সেন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮০৮ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে আরো ৯ জন ব্যক্তি কোরআন অনুবাদ করেছেন। তা ছাড়া ২০১১ সালকে বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের ২০০ বছর পূর্তি বছর হিসেবে উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় এ বিষয়ে আরো অনেক অজানা তথ্য জনসমক্ষে আসতে শুরু করেছে। আজ আর নয়। আমীন।
লেখক : মাওঃ মোঃ মোশাররফ হোসাইন, প্রভাষক(আরবী), মান্দারী আলিম মাদ্রাসা, চাঁদপুর। খতিব কালেক্টরেট জামে মসজিদ, চাঁদপর।#

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.