রাণীনগরের তৈরি মাটির পাতিল চালান হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে

কাজী আনিছুর রহমান,রাণীনগর (নওগাঁ) :
নওগাঁর রাণীনগরের মাটির তৈরি পাতিল দামে কম মানে ভাল হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালান হচ্ছে। আধুনিকতার দাপটে মৃৎ শিল্পের তৈরি পূর্ণ সামগ্রী গুলো মালদাত্তা আমল থেকে গ্রামীণ জনপদের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সাংসারিক কাজে ব্যবহৃত মাটির তৈরি হাড়ি, পাতিল, থালা, কলস, ঝাজর’র বেশ কদর থাকলেও প্লাস্টিক এ্যালোমিনিয়াম সিলভার মালামাইনের তৈরি সামগ্রী গুলো পারিবারিক ব্যবহৃত কাজে দখল করায় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের কদর এমনিতেই কমে গেছে। তারপরও উপজেলার গহেলাপুর, খট্টেশ্বর, আতাইকুলা, ভান্ডারা, ভান্ডারগ্রাম সহ বিভিন্ন গ্রামের আদি পাল বংশের লোকজনরা এই ব্যবসা জীবন-জীবিকার তাগিদে পৈতিক সূত্রে পাওয়া এই ব্যবসা ঢিমে তালে চালিয়ে যাচ্ছে। কি লাভ কি লোচ সেই দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে পাল পাড়ার লোকজন তাদের জাতি পেশা শক্ত করে আঁকড়ে আছে।

ডিজিটালের এই সময়ে নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পরিবারের সকল সদস্য মিলে হার ভাঙ্গা পরিশ্রম করে গহেলাপুর গ্রামের পাল পাড়ার লোকজন ভাল মানের মাটির পাতিল তৈরি করে স্থানীয় বাজার সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইকারি চালান করছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিন অঞ্চলের এক শ্রেনীর মাটির পাতিল পাইকারী ব্যবসায়ীরা রাণীনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পালপাড়া থেকে নানান মাপের মাটির পাতিল পাইকারী দরে কিনে রেল সহ বিভিন্ন যানবাহন যোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে পাইকাররা সরাসরি গ্রামে গিয়ে পাতিল তৈরি করছে এমন কারিগরদের কাছ থেকে নগদ টাকায় পাতিল কেনা-বেচা করছে। পাইকারদের কাছে বিক্রয় করার পর যে পরিমাণ পূর্ণ সামগ্রী হাড়ি, পাতিল থাকে তা আবার এই পেশার সাথে জরিতরা স্থানীয় বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রামে-গঞ্জে বেচা-কেনা করে।

বিভিন্ন এলাকায় মৃৎ শিল্পের দূর্দিন চললেও একমাত্র রাণীনগর উপজেলায় কয়েকটি গ্রামের পাল পাড়ায় পুরোদমে চলছে মাটির পাতিল তৈরির জমজমাট কর্ম যজ্ঞ। এই অঞ্চলের মাটি মৃৎ শিল্পে উপযুগী হওয়ায় ভাল মানের পাতিল তৈরি করায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা মত পাতিল চালান হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেন যোগে দক্ষিন জনপদে রাণীনগরের মাটির তৈরি পাতিল বেশি চালান হচ্ছে। চাহিদা বেশি থাকায় দিনদিন এই পাতিলের কদরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় মাটির তৈরি জিনিসপত্র চাহিদা শূন্য কোঠায় পৌছলেও দিনদিন এর চাহিদা বাড়ার কারণে এই পেশার সাথে জরিতরা কিছুটা ঘুড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আধুনিক পদ্ধতিতে মাটির পাতিল তৈরির কোন কৌশল কিংবা উন্নয়নের কোন ছোঁয়া পাল পাড়াই পৌছে না। বাপ-দাদারা যে ভাবে পাতিল তৈরি করে গেছে ওই আগের পদ্ধতিতেই চলছে তাদের কর্মকান্ড। সরকারি সহযোগীতা ও উন্নত কারিগরি পরামর্শ পেলে মৃৎ শিল্পের সামগ্রী গুলো আগের মতই ফিরে পাবে ঐতিহ্য এমনটায় আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেননা এখন পর্যন্ত বাংলাজাতির ঐতিহ্যবাহী উৎসব গুলো মৃৎ শিল্পের মাটির তৈরি সামগ্রীর সাথে জরিত।

কুষ্টিয়া থেকে আসা মাটির তৈরি পাতিলে পাইকারি ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম (৩৫) জানান, আমি প্রায় ৪ বছর ধরে রাণীনগরের গহেলাপুর পালপাড়া গ্রাম থেকে মাটির তৈরি পাতিল সহ নানান সামগ্রী এখান থেকে কিনে নিয়ে ট্রেন যোগে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, ভেরামারা, দর্শনা এলাকায় খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করি। এখানকার পাতিল ভাল হওয়ার কারণে আরও অনেক পাইকার এখানে আসে। প্রতি পিচ ছোট সাইজের মাটির পাতিল পাইকারি মূল ৭ টাকা, মাঝারি সাইজের ১০ টাকা এবং বড় সাইজের পাতিল ১৪ টাকা পাইকারি দরে ক্রয় করি। যা নিয়ে গিয়ে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করে আমার ভালই লাভ হয়। একটু কষ্ট হলেও এই মূহুর্তে এটায় আমার প্রিয় ব্যবসা।

গহেলাপুর গ্রামের অর্জন পাল জানান, আধুনিকতার কাছে মৃৎ শিল্পের তৈরি সামগ্রী গুলো টিকতে না পারাই আমাদের এই জাতি ব্যবসা ছেড়ে অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। আমরা ছোট-খাটো মানুষ টাকা-পয়সা তেমন না থাকার কারণে এই পেশা ছাড়তে পারছি না। বিগত কয়েক বছর এই পেশার সাথে জরিতদের খুব দূর্দিন গেছে। তারপরও আমি পৈতিক এই পেশা ছাড়িনি। ইদানিং আমাদের তৈরি মাটির পাতিল, হাড়ি, কলস, ঝাজর বাজারে কদর বাড়ার কারণে এখন আমাদের ব্যবসাটা কোন মতে চলছে। সরকারি কিছু সুযোগ-সুবিধা পেলে মৃৎ শিল্প ব্যবসাটি ঘুড়ে দাঁড়াতে পারে। #

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.