পবিত্র কুরবানীর ইতিহাস গুরুত্ব ও মহাত্ন

পবিত্র কুরবানীর ইতিহাস গুরুত্ব ও মহাত্ন

ড. মোঃ রুহুল আমীন খান,

কুরবানী শব্দটি আরবী কুরবান শব্দ থেকে গঠিত। আর কুরবান শব্দটি কুরবাতুন শব্দ থেকে উৎপন্ন। আরবী “কুরবাতুন” এবং কুরবান উভয় শব্দের শাব্দিক অর্থ নিকট বর্তী হওয়া, কারো নৈকট্য অর্জন করা প্রভৃতি।

ইসলামী পরিভাষায় কুরবান ঐ বস্তুুর নাম যা দ্বারা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করা যায়। বর্তমানে আমাদের নিকট কুরবানীর জানোয়ারকেই বিশেষ ভাবে কুরবান বলা হয়। সুতারং যবেহ কৃত জন্তুুকেই কুরবান বলা হয়। যা লোকেরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য উপস্থাপন করতে থাকে।

উপমহাদেশে কুরবানী বলতে বুঝায় জিলহজ্জ মাসের ১০ম থেকে ১২বা ১৩ তারিখ পর্যন্ত আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্য উট, গরু, বকরী ও ভেড়া প্রভৃতির মধ্যে হতে কোন এক জন্তুুকে নহর বা যবেহ করা। কোরানে কুবানীর পরিবর্তে কুরবান শব্দটি মোট ৩ জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- সুরা আল ইমরান আয়াত -১৮৩ সুরা মায়েদাহ আয়াত ২৭ সুরা আহকাফ আয়াত ২৮ হাদীস শরীফে কুরবানী শব্দটি ব্যবহার না হয়ে তার পরিবর্তে উদহিয়্যাহ এবং যাহিয়্যাহ, প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এ জন্য কুরবানীর ঈদকে ঈদুল আযহা বলা হয়। ফার্সী , হিন্দি ও উর্দুতে আরবী কুরবান শব্দটি কুরবানী অর্থে ব্যবহৃত হয়। বাংলায় মুসলমানগন বিশেষ ভাবে কুরবানী শব্দটির সাথে খুবই পরিচিত।

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যাবে যে, কুরবানী কবে থেকে চালু হয় এ সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আলকুরআনে ঘোষনা আছে যে, “আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুবানীর নিয়ম করে দিয়েছি যেন তাদেরকে জীবনোপ করন স্বরূপ যেসব চতুস্পদ জন্তুু দিয়েছেন, সে গুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারন করে তোমাদের প্রভু এক ইলাহ। সুতারং তোমরা তারই নিকট আতœসমর্পন কর এবং সুখবর দাও ঐ সব বিনীতদেরকে “(সুরা আল হজ্জ আয়াত ৩৪) আল্লামা নাসাফী ও যামখশারী বলেন হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে আল্লাহ তায়ালা তার নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের সুরা মায়েদাহ এর ৮ম রুকুতে পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) তার দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের কুরবানীর বর্ননা রয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম কুরবানী।

মুফাসসিরে কুরআন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন আদম (আঃ)ও মা হাওয়ার গর্ভে তৎকালীন জোড়া জোড়া সন্তান জন্ম হতো একজন ছেলের সাথে একজন মেয়ে এই ভাবে চলে আসতেছিল কেবল মাত্র শীষ (আঃ) ব্যতীত। এবং বিধান ছিল যে এক জোড়ার ছেলের সাথে অন্য জোড়ার মেয়ের বিয়ে দিতেন। তারই ধারাবাহিকতায় কাবীলের সাথে সুন্দরী মেয়ে জন্ম গ্রহন করেন যার নাম ছিল ইকলীমা এবং হাবিলের সাথে জন্ম গ্রহণ করেন লিয়ুযা, বিধান মোতাবেক কাবীলের বিবাহ হবে লিয়ুযার সাথে আর হাবিলের বিবাহ হবে ইকলীমার সাথে। কিন্তু ইকলীমা ছিল একটু সুন্দরী। কাবিল এই বিধান কে মানতে অস্বীকার করল এবং উদ্যত হয়ে হাবিল কে হত্যা করল, পরে আল্লাহর নির্দেশে উভয় কোরবানী করল। হাবিলের কুরবানী কবুল হল আর কাবিলের কুরবানী কবুল হলনা। তাই আদম (আঃ) এর দুই পুত্র কাবীল ও হাবিলের কুরবানীর পর থেকে ইব্রাহীম (আঃ) পর্যন্ত কুরবানী চলতে থাকে। (সুরা আল হজ্জ-৩৪) এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। বর্তমানে আমাদের উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে যে কুরবানী বিধান চালু আছে তা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর নিজ পুত্র ঈসমাইলকে কুরবানী করার সাথে সংশ্লিষ্ট।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তার প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কুরবানী দিয়ে যে মহান আদর্শ উপস্থাপন করেছিলেন সে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্মৃতি নিয়ে প্রতি বছর আমাদের সামনে হাজির হয় “ঈদুল আযহা” বা কুরবানীর ঈদ।এ কুরবানী সম্পর্কে একদা মহানবী (সাঃ) কে তার কতিপয় সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন (ইয়া রাসুলুল্লাহ মা-হা-যিহিল আদা-হী) অর্থ হে আল্লাহর রাসুল কুরবানী কি জিনিস ? তিনি বলেন (সুন্নাতু আবীকুম ইব্রাহিম (আঃ) ) অর্থ এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আঃ) এর আদর্শ। এবার তারা বললেন এতে আমাদের উপকার কি? তিনি বললেন কুরবানীর জানোয়ারের প্রত্যেক চুলের পরিবর্তে তোমরা একটি করে নেকী লাভ করবে (ইবনে মাজাহ, মিশকাত , মুসনাদে আহমদ)

বিশ্ব নবীর এই হাদীস অনুযায়ী এবং যারা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে একটু চিন্তা গবেষনা করেন তাদের মাথায় একটি প্রশ্ন উদয় হতে পারে যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মধ্যে এমন কি গুন ও বৈশিষ্ট্য ছিল যে যার ফলে মহান আল্লাহ তার আদর্শকে কিয়ামত পর্যন্ত জীবন্ত ও প্রানবন্ত করে রাখলেন ? উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য ঐ আদর্শকে আনন্দ ও খুশির উৎসে পরিনত করলেন। যুগে যুগে অনেক নবী আগমন করেছেন মানব জাতির হেদায়েতের জন্য কিন্তুু কারো আদর্শই এ সম্মান ও মর্যাদা পাননি।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ব্যবিলনের একটি জায়গা ছিল ‘উর’ যাহা বর্তমান নাম ইরাক সেখানে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর জাতি শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত হলে ও তারা সবাই চাঁদ, সুর্য, তারকা, প্রতিমার পুজারী মুশরিক ছিল। আর তাদের পুরোহিত ছিলেন আযর। এ মুশরিক আযরের ঘরে জন্ম গ্রহন করে ছিলেন একত্ববাদী হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। আর ইব্রাহীম (আঃ) যখন উপলদ্ধি করলেন যে তাঁর পিতা ও আতœীয় স্বজন সহ সমস্ত দেশবাসী তাঁর একত্ব বাদের বানী গ্রহন করতে কোন মতেই রাজী নয় তখন তিনি স্বীয় ঘর বাড়ী, ধন-সম্পত্তি ও স্বীয় মাতৃভুমি সহ সব কিছু বিসর্জন দিয়ে তার সহ ধর্মিনী সারা ও ভাইপো লুত (আঃ) কে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় হিযরত করলেন। এবং দেশবাসীকে বললেন আমি তো আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম তিনিই আমাকে গন্তব্যে পৌছিয়ে দিবেন (সুরা আল সাফফাত ৯৯) তখন তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই প্রথম আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করেন। পথিমধ্যে বিবি সারার উপর পাশবিক হামলার চেষ্টা হলো। কিন্তুু মহান আল্লাহর করুনায় মুসিবতের সে মেঘ কেটে গেল এবং প্রতি ফল স্বরূপ তিনি একটি তুহফা বিবি হাজেরাকে উপহার দিলেন। পরে তাকে তিনি স্বীয় অর্ধাঙ্গীনীরূপে গ্রহন করেন। এভাবে ৮০ বছর চলে গেল। ইব্রাহীমের ঘরে কোন সন্তান জন্ম হয়নি। তাই তিনি আল্লাহ তায়ালার দরবারে প্রার্থনা করলেন অনুনয় বিনয় করে বললেন হে আমার প্রতি পালক আমাকে একটি সু পুত্র দান করুণ (সুরা সফফাত-১০০) ফরিয়াদ গ্রহন করে অত:পর আল্লাহতাকে একটি “ধৈর্য্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করেন (সুরা সফফাত-১০১) হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর ঘরে একটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহন করলেন। যার নাম রাখা হইল ঈসমাইল। তখন ইব্রাহীমের বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। অন্যদিকে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আবার পরীক্ষার ধারা শুরু হলো। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে আল্লাহ তায়ালা ৭টি বিষয় কেহ বলেন ৭০টি আবার কেহ বলেন ৭০০ বিষয় সম্পর্কে পরীক্ষা করা হলো কিন্তুু হযরত ইব্রাহীম (আঃ) প্রত্যেকটি বিষয় উত্তীর্ন হলেন। হযরত ঈসমাইল (আঃ) এর বয়স যখন ৭ বছর কেউ বলেন ১৩ বছর অর্থাৎ পিতার সাথে চলা ফেরার বয়সে উপনীত হয়েছেন। এমন সন্তান কে কুরবানী করা অনেক কঠিন ব্যাপার। কিন্তুু হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে স্বপ্নে হুকুম দেয়া হলো যে, তুমি তোমার কলিজার টুকরা ঈসমাইলকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ কর। এ স্বপ্ন তিন পরপর তিন রাত্র দেখলেন।

যিলহজ্জ মাসের রাত্রে তিনি সর্ব প্রথম স্বপ্ন দেখলেন যে একমাত্র পুত্রকে নিজ হাতে যবেহ করেছেন। স্বপ্ন দেখার পর ঐ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি চিন্তায় বিভোর যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন, অতঃপর ৯ম রাতে তিনি ঐ একই স্বপ্ন দেখেন তখন তিন বুঝতে পারেন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সত্যিকার স্বপ্ন। তার পর ১০ম রাত্রে আবার ঐ একই স্বপ্ন । তাই ঐ দিনে তিনি কুরবানী করতে উদ্যত হন পরপর ৩ রাত স্বপ্ন দেখার পর তার মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তারই পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত ৩টি দিন বিশেষ নামে বিশেষিত হয়েছে-
যিল হজ্জেরঃ-
৮ম দিনের নাম “ইয়াওমুত তারবিয়াহ” চিন্তাভাবনার দিন।
৯ম “ইয়াওমুল আরাফাহ” জানার দিন।
১০ম “ইয়াওমুন নাহর” কুরবানীর দিন।

পুত্রকে কুরবানী করানো আল্লাহ তায়ালার মূল উদ্দেশ্য ছিলনা উদ্দেশ্য ছিল মুলত পিতা-পুত্রের পরীক্ষা নেওয়া এই

স্বপ্ন দেখার পর ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে কোরবানী করার জন্যে তার স্ত্রী বিবি হাজেরাকে বললেন ছেলে টাকে ভাল পোশাক পরিয়ে প্রস্তুুত করে দাও তাকে একটি কাজে নিয়ে যাব। এদিকে শয়তান বিবি হাজেরাকে ধোকা দিতে শুরু করে। এবং ছেলে ইসমাইল (আঃ) কেও ধোকা দিতে শুরু করে ঐতিহাসিকদের বর্ননা মতে শয়তান তিন বার হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তুু প্রতি বারে তিনি ৭টি কঙ্কর মেরে শয়তান কে বিতাড়িত করেন। তার স্মৃতি আজও প্রতি বছর হজের সময় পালন করা হয়। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তার ছেলেকে বললেন হেবৎস আমি স্বপ্ন দেখতেছি যে, আমি যেন তোমাকে যবেহ/কুরবানী করছি। সুতারাং তোমার অভিমত কি ? সে বলল হে আমার পিতা আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন অবশ্যই আমাকে ধৈর্য্যশীলদের অর্ন্তভুক্ত পাবেন । (সুরা সাফফাত ১০২) এভাবে পিতা-পুত্রের সাওয়াল যওয়াবের পরে ছেলে যখন রাজি হয়ে গেল তখন মহান আল্লাহর সামনে নিজ কলিজার টুকরাকে ছিড়ে রেখে দিলেন।

পিতা এবং পুত্র উভয় যখন এক মত হলেন তখন পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে কাত করে শুয়ালেন তখন পুত্র পিতাকে বললেন যে আপনি আমাকে চোখ দেখা অবস্থায় যবেহ করতে পারবেন না। কারন আপনার হয়তো ছেলের মায়া উথলে উঠতে পারে ফলে আপনার ছুরি নাও চলতে পারে আমি হয়ত অধৈর্য্য হয়ে ছটফট করব আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। তাই আমাকে আপনি শক্ত করে বেধে নেন এবং আমাকে উপুড় করে শুইয়ে দিন। এবার ছেলেটির গলায় ছুরি চালাবার পালা। আল্লাহর হুকুমের কাছে আতœ সমার্পনের মূর্ত প্রতীক ইব্রাহীমের হাতে যখন ছেলেটির ঘাড়ে ছুরি চালিয়ে দিল বিশ্ব জাহান তখন কেপে উঠল। সে কি এক অভিনব দৃশ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে এ পর্যন্ত এমন কোন ঘটনা ঘটেনি যে পিতার হাতে পুত্রকে কুরবানী ভবিষ্যৎ আর এমন ঘটনা ঘটবে কিনা তাও কে বলতে পারে।

ঐতিহাসিক মিনা প্রান্তরে এ ঘটনা ঘটে। ইমাম সুদ্দী (রাঃ) বলেন একদিকে আল্লাহ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে হুকুম দিয়েছেন নিজ হাতে তুমি তোমার প্রিয় পাত্র নিজ ছেলেকে কুরবানী কর বা যবেহ কর অন্য দিকে তিনি ছুরিকে নির্দেশ দিয়েছেন তুমি মোটেই কেটোনা ফলে ছুড়ি ও তার ঘাড়ের মাঝখানে আল্লাহর কুদরতে একটি পিতলের পাত আর সৃষ্টি করে। সে জন্য ইব্রাহিম (আঃ) বাব বাব ছুরি চালালেও কোন কাজ হচ্ছিলনা।

এ পরিস্তিতিতে বিশ্ব জগতের সবাই যখন হতভম্ভ এবং হতবাক ও শ্বাসরুদ্ধ তখন মহান আল্লাহ তার রহস্য ফাস করে দিয়ে জান্নাত থেকে জিব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন এবং ইসমাইলকে বাচিয়ে নিয়ে ইব্রাহিমের অজান্তে সে দুম্বাটি তার দ্বারা যবেহ করিয়ে দিয়ে ঘোষনা করলেন তখন আমি তাকে ডেকে বললাম: হে ইব্রাহীম তুমি স্বপ্নকে সত্য প্রমান করে দেখালে । আমি এই রূপেই খাটি বান্দাদের কে পুরস্কার দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল একটি সু ¯পষ্ট পরীক্ষা । আর আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান যবেহের বিনিময়। (সুরা সফফাত ১০৪-১০৭)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সহ অনেক মুফাসসিরীনদের এর মতে ইব্রাহীমের কাছে যে দুম্বাটি পাঠানো হয়েছিল সেটি জান্নাতে ৪০ বছর ধরে লালন পালন করা হয়েছিল। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন ইসমাইল কে যবেহ করেছিলেন। তখন জিব্রাইল (আঃ) বলেছিলেন আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। অত:পর ইব্রাহিম (আঃ) বলেন আল্লাহু আকবার। ওয়ালিল্লাহেল হামদ। তার পর থেকে এ তাকবীরটি চিরস্থায়ী সুন্নাতে পরিনত হয়। আর আল্লাহ বলেন আমি তার জন্য এ বিষয়টি ভবিষ্যৎ বংশধরদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাখলাম। সালাম বর্ষিত হোক ইব্রাহীমের উপর (সাফফাত-১০৮-১০৯)আল্লাহর ঘোষনা মোতাবেক তখন থেকে চলে আসছে এ ইব্রাহীম (আঃ) এর আদর্শের বাস্তবায়ন। তাই আজ পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ আল্লাহর হুকুমের প্রতি পালানের সাথে সাথে প্রতি বছর ইব্রাহিমের স্মৃতি পালন করে পাপ মোচন করছে। এবং ইব্রাহিম (আঃ) এর আদর্শ কে কিয়ামত পর্যন্ত চিরস্থায়ী করে দিয়েছেন। যা বিশ্বের তাওহীদ বাদীদের হৃদয় বিজয়ী।

গুরুত্বঃ

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কায় ১৩ বছর অতিবাহিত করে তিনি আল্লাহর নির্দেশে মদিনায় হিজরত করেন অত:পর কিছু দিনের মধ্যে তিনি আল্লাহর পাক্ষ থেকে কুরবানী করার নির্দেশ পান। এর পরে তিনি ১০ বছর বেচেছিলেন এ ১০ বছরই তিনি কুরবানী করেন। পরে মদিনায় অবস্থান কালেও তিনি কুরবানী করতে থাকেন।

উপরোক্ত বর্ননা দ্বারা বুঝা যায় যে রাসুল (সাঃ) বলেন ইবনে মাজার হাদীসে যে ব্যক্তি কুরবানীর সামর্থ্য রাখে অথচ কুরবানী করেনা সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে (ইবনে মাজাহ) ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর মতে প্রত্যেক স্বাধীন, ধনী ও ঘরে অবস্থান কারী মুসলমানের উপর কুবানী ওয়াজিব। (হিদায়া ৪র্থ-৪৩৩পৃ) কারো কারো মতে কোরবানী করা সুন্নাতে মুয়াক্কদা। আর আল্লাহর কাছে পৌছেনা এ গুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তার কাছে পৌছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবেই তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। যেন তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষনা করা, যেহেতু তিনি তোমাদের কে সঠিক পথ দান করেছেন। আর সংবাদ দাও সৎ কর্মশীল লোকদেরকে (সুরা আল-হজ্জঃ আয়াত ৩৭)

কুরবানীর মহাত্ন:

রাসুল (সাঃ) ইয়াওমুনাহর ঈদের দিন আদম সন্তান যত কাজ করে ত¤œধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ রক্তপাত। এ জানোয়ার কিয়ামতের দিন তার শিং ও পশম এবং খুর সহ নিশ্চয়ই হাজির হবে আর তার রক্ত যমিনে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা কবুলিয়াতের দরবারে পৌছে যায়। সুতারং তোমরা কুরবানী দিয়ে নিজেদের মনকে তৃপ্ত কর। একদা সাহাবায় কেরাম রাসুল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন কুরবানী কি ? হুজুর বললেন এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের সুন্নাত ও আদর্শ। আবার প্রশ্ন করা হলো এতে আমাদের উপকার কি? তিনি বললেন প্রত্যেক পশমের বদলে একটি করে নেকী রয়েছে। মুলতঃ কুরবানীর বাস্তবতা ছিল এটাই যে, বান্দা নিজের প্রান আল্লাহ তায়ালার জন্য উৎসর্গ করিবে। কুরবানীর দুটি দিক (১) বাহ্যিক (২) আভ্যন্তরীন। বাহ্যিক দিক হলো পশু জবাই। আর আভ্যন্তরীন দিক হলো আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ করা এবং সেদিকে ধাবিত করা।

ঈদের দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাবঃ

(১) শরীয়াতের মধ্যে থেকে সাজ সজ্জা করা (২) গোসল করা (৩) মেসওয়াক করা (৪) সাধ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করা (৫) সুগন্ধি ব্যবহার করা (৬) খুব সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া (৭) সকাল সকাল ঈদগাহে গমন করা (৮) ঈদগাহে যাওয়ার আগে মিষ্টি খাওয়া ঈদুল ফিতরে কিন্তুু ঈদুল আযহায় নয় (৯) ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকায়ে ফিতর আদায় করা (১০) ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা (১১) এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে গমন অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা (১২) পায় হেটে ঈদগাহে যাওয়া (১৩) ঈদগাহে যাওয়ার পথে তাকবীর বলতে বলতে যাওয়া। ইত্যাদি। #
লেখকঃ- ড. মোঃ রুহুল আমীন খান, অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মোরেলগঞ্জ লতিফিয়া ফাজিল মাদরাসা।

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.