ঈদের চাঁদ সম্পর্কিত একটি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গে কুড়িগ্রামবাসী ও জেলার ডিসি’র বিশেষ ভূমিকা

বিশেষ প্রতিবেদনঃ সমগ্র বাংলাদেশ সহ সারাবিশ্বের বাংলাদেশীদের মাঝে ঈদকে কেন্দ্র করে দুটি বিষয় এখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে আলোচিত হচ্ছে। সাতশ ত্রিশ টাকার পাঞ্জাবি দ্বিগুণ দামে বিক্রির দায়ে রাজধানীর উত্তরায় জনপ্রিয় ব্র্যান্ড আড়ংয়ের ফ্ল্যাগশিপ আউটলেটে গত সোমবার অভিযান চালিয়ে সেটি বন্ধ করে দেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। এর কয়েক ঘণ্টা পরই আবার সেটি খুলে দেয়া হয়েছে।

এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক পদ থেকে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা পদে খুলনা জোনে বদলি করা হয়।আড়ংকে জরিমানা করার কয়েক ঘণ্টার মাথায় সেই কর্মকর্তা বদলি শিরোনামে ফেসবুকে ঝড় শুরু হয়ে যায়। ঢাকা সহ সারাদেশে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লাখ। বলতে গেলে একটিভ সকল ফেসবুক ইউজার এই বিষয়টিতে মারাত্বক ভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, দেশের বাইরে থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টির সন্তোষজনক সমাধান টেনে দেন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার এর বদলীর আদেশটি বাতিল করা হয়। এই বদলীর আদেশ নিয়ে স্বয়ং জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ব্যাখ্যা প্রদান করতে বাধ্য হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রসঙ্গটির রেশ শেষ না হতেই গত ৪ঠা জুন ২৯ রোজা পূর্ণ হয়। সারাদেশের জনগণ ৫ই জুন বুধবার ঈদুল ফিতর উদযাপনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেন। কিন্তু সূর্যাস্ত ও ইফতারের পরেও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন ঘোষণা না হওয়াতে টিভি স্ক্রিনে সুতীক্ষ্ণ নজর রাখেন সমগ্র দেশবাসী। প্রবাসী বাংলাদেশিরা ইন্টারনেট কলে ব্যস্ত করে তোলেন প্রিয় স্বজনদের। অবশেষে প্রায় তিন ঘন্টা পর টিভি স্ক্রিনে ভেসে উঠে ব্রেকিং নিউজ। দেশের কোথাও চাঁদ দেখতে না পাওয়ায় ৫ই জুন বুধবারের পরিবর্তে ৬ই জুন বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হবে মর্মে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ঘোষণা করেন।

সামাজিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় শুরু হয়। সবচেয়ে বিপাকে পড়েন প্রতিটি পরিবারের গৃহিণীরা। ঈদের অর্ধরান্না নিয়ে কি করবেন, এ নিয়ে যখন কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না তখন পুরুষরা মসজিদগামী হয়েছে তারাবীহ নামাজ আদায়ের জন্যে।

তীব্র সমালোচনার মুখে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি পড়েন ফেসবুকে। ঝড় বয়ে যায় ফেসবুকের টাইমলাইনে।

বাংলাদেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামে ঘটছে তখন ভিন্ন ঘটনা।টিভির ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, রৌমারী উপজেলা সহ বাকি উপজেলার অনেকেই জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতানা পারভীন এর মুঠোফোনে কল দিতে শুরু করলেন। কেউ বলছেন স্যার, কেউ বলছেন ম্যাডাম আবার কেউ আপা সম্বোধন করে বলছেন, আমরা শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখেছি। আগামীকালকে ঈদ হতেই হবে।

Best Practice of Governance and Strategy Management for Accountability’ শীর্ষক এক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহনের জন্যে ১৫ দিনের সফর করে ট্রানজিট সহ ১৬ ঘন্টার দীর্ঘ আকাশ ভ্রমণ শেষে জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতানা পারভীন ঢাকার হযরত শাহজালাল (র:) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করেন ৩রা জুন দিবাগত রাত ১১ টায়। সরাসরি বিমানবন্দর থেকে সড়ক পথে সুলতানা পারভীন যাত্রা শুরু করেন কর্মস্থল কুড়িগ্রামের উদ্যেশ্যে। টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জে প্রচন্ড জ্যাম অতিক্রম করে ১৮ ঘন্টা পর কুড়িগ্রামে পৌঁছেই তিনি মুখোমুখি হন কুড়িগ্রাম জেলাবাসীর মোবাইল ফোনের জবাবদিহিতায়।

বিষয়টি জাতীয় এবং ঈদ উদযাপনেই মত একটি স্পর্শকাতর বিধায় তিনি সংশ্লিষ্ঠ সকলের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির সুরাহা টানতে সার্বিক সহযোগিতা করেন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের নিকট বিধিমোতাবেক ইউএনও গণের লিখিত রিপোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে প্রেরণ করেন।ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে আবারো জাতীয় চাদ দেখা কমিটি জরুরী সভা করে রাত ১১ টার পর পুনঃ ঘোষণা দেন ৫ই জুন বুধবারই ঈদ হবে।

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনালাপে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতানা পারভীন জানান, প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসাবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। ধন্যবাদ পাওয়ারযোগ্য কেউ হলে, তা আমার প্রিয় জেলাবাসী। সহজ সরল মাটির মানুষ আমার কুড়িগ্রামবাসীরা সঠিক সময়ে চাঁদ দেখার বিষয়টি আমাকে অবহিত করে সঠিক দিনে ঈদ উদযাপনের সহায়তা করেছেন।

কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং সময় টিভির জেলা প্রতিনিধি মমিনুল ইসলাম মঞ্জু জানান, জেলা প্রশাসক মহোদয়কে আমি ফোন করি, তখন রাত ১০ টা বেজে ৪৯ মিনিট। মূলতঃ ডিজিটাল ব্যবস্হা এবং জেলা প্রশাসকের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দক্ষতা ও আন্তরিকতার কারণে দ্রুত প্রক্রিয়াগুলো সমাপ্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কাঙ্খিত দিনে আমরা ঈদ করতে পেরেছি।

এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে ফেসবুকে ঈদ উদযাপনের আলোচনা সমালোচনার ঝড় বয়ে গেলেও সঠিক দিনে ঈদ উদযাপনের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কুড়িগ্রাম জেলাবাসী, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অতঃপর সংশ্লিষ্ঠ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে দেশবাসী। #