মাগো তোর মুজিব এলো ফিরে,আজ বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস


নিউজ ডেস্কঃ ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর একটি বিমানে করে দশ জানুয়ারি সকালে এসে পৌঁছান দিল্লিতে। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের রাষ্ট্রপতি, সমগ্র মন্ত্রীসভা, তিন বাহিনীর তিন প্রধানসহ ভারতের অন্যান্য সন্মানিত ব্যক্তিরা শেখ মুজিবকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সহযোগিতা করায় ভারতের নেতৃবৃন্ধ ও জনগণকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান শেখ মুজিবুর রহমান। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথেও একটি বৈঠকে অংশ নেন তিনি। সেদিন, অর্থাৎ ১০ জানুয়ারি বিকেলেই শেখ মুজিব ও কামাল হোসেন ঢাকায় এসে পৌঁছান।

বঙ্গবন্ধু আসবেন বলে রেসকোর্স ময়দান ও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত রাস্তা ছিল লোকে লোকারণ্য, এ যেন মানুষের সমুদ্র। বিমান থেকে বঙ্গবন্ধুর নামার সাথে সাথে এক আবেগঘন ও আনন্দমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মুহুর্মুহু শ্লোগান, ফুলের মালা আর পুষ্প বৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেয়া হয়। বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত শেখ মুজিব গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে নাড়তে রাস্তার দু’পাশের লাখ লাখ মানুষের অভিবাদন গ্রহণ করেন। বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় দশ লাখ মানুষের সামনে তিনি ভাষণ দেন।

এই সেই রেসকোর্স ময়দান, ৭ মার্চ যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। জনতার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় আবেগাপ্লুত শেখ মুজিবর রহমান ভাষণ দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাব।” ভাষণে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে পূর্ণ উদ্দ্যমে দেশ গড়তে কাজে নেমে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন।

অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে না পারলে প্রাপ্ত স্বাধীনতা মূল্যহীন হয়ে যাবে, তাই অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে কাজ করতে সবাইকে তিনি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “ইনশাল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি, তখন স্বাধীন থাকবো। একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে কেউ আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারবেন না। … এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।” বঙ্গবন্ধুর আগমণের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের একটা সংকটও দূর হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে বড় মাপের অনেক নেতা ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত এই সব বড় নেতাদেরকে একসাথে করে তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার মত তাদের চেয়েও বড় মাপের নেতা বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সে অভাব দূর হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন “ফাদার ফিগার”। সাধারণ জনগন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবার মধ্যে তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয় এবং সন্মানিত ব্যক্তি।

যুদ্ধ পরবর্তী বিশৃংখল দেশকে শৃঙ্খলায় আনতে ও উন্নতির চাকা চালু করতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব গ্রহণ ছিল সময় ও পরিস্থিতির দাবী। সবকিছু মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা, সে সময় যে খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু সশরীরে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি। তবু সমগ্র মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন একটি প্রভাব বিস্তারকারী চরিত্র। তার কথায় বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাই, ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ যে বিজয় অর্জন করেন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সে বিজয় পূর্ণতা পায়।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই কোন না কোন স্বজন হারিয়েছেন। এই স্বজন হারা মানুষগুলোও তাদের কষ্ট বুকে চেপে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবরে আনন্দিত হয়ে উঠেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে তাই পরের দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়া পর বাংলাদেশের মানুষদের মনে একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছিল– একটি সদ্য স্বাধীন দেশ নানা সমস্যায় জর্জরিত। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে বলে চারদিকে ধ্বংস আর বিনাশের চিহ্ন। এর থেকে মুক্তির উপায় কি?

বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার পর মানুষের মন থেকে এই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটে যায়। নেতা এসে গেছেন। এবার তার নেতৃত্বে যেভাবেই হোক কিছু না কিছু হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের মানুষদের জন্য ছিল প্রেরণা আর আত্মবিশ্বাসের চমৎকার একটি উৎস। ধ্বংস আর শোকের মধ্যে বসবাস করা মানুষদের জন্য শোককে শক্তিতে আর হতাশাকে স্বপ্নে পরিণত করতে প্রেরণা আর আত্মবিশ্বাসের এ রকম একটা উৎসের খুব দরকার ছিল সেসময়। সবকিছু মিলিয়ে তাই বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ান এক সম্পাদকীয়তে সঠিক পর্যবেক্ষণটিই উল্লেখ করেছিল – “তার এই মুক্তি বাংলাদেশকে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে।”

শহিদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর তার ডায়রিতে লিখেন, “স্বাধীনতার জন্য হাসি। কিন্তু হাসিটা ধরে রাখা যাচ্ছে না। এত বেশি রক্তে দাম দিতে হয়েছে যে কান্নার স্রোতে হাসি ডুবে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে।” সেই সাথে বাঙালির মনে আরেক দুশ্চিন্তা – বঙ্গবন্ধু কেমন আছেন? তিনি কি বেঁচে আছেন? স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি কবে ফিরে আসবেন? বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা পাচ্ছিল না।

যার ডাকে বাংলার মানুষ মুক্তির সংগ্রামে যোগ দিয়েছে, যার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তার অনুপস্থিতি স্বাধীন বাংলাদেশের জনগনকে নিদারুণ পীড়া দিচ্ছিল। পাক হানাদাররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় হামলার শুরুতেই- ২৫ মার্চ রাতে। তারপর তাকে পাঠিয়ে দেয় পশ্চিম পাকিস্থানের কারাগারে। সেখানে তাকে বাইরের পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি- আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইয়াহিয়া সরকার শুরু করে শেখ মুজিবের তামাশার বিচার। বিচার শুরু করার উদ্দেশ্য তিনটি –

১) পশ্চিম পাকিস্থানের জনগণকে খুশি করা

২) শেখ মুজিবকে ভয় দেখিয়ে আপোষ করতে বাধ্য করা

৩) শেখ মুজিবের মুক্তির বিনিময়ে বাংলার নেতাদের মীমাংসায় আসতে চাপ দেয়া। শেখ মুজিব ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। তামাশার বিচারে ফাঁসি দিতে চাইলে দিক, শেখ মুজিব শুধু বললেন, “আমার লাশটা বাংলার মানুষের কাছে পাঠিয়ে দিও।” শেখ মুজিব নিজের পক্ষ সমর্থনের জন্য কোন আইনজীবীও নিয়োগ করেন নি। পাকিস্থান সরকার নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে তার আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দিলো বিখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহিকে। তামাশার বিচারের রায় আগেই ঠিক হয়ে আছে- শেখ মুজিব আর তার আইনজীবী ব্রোহি সেটা জানতেন। তাই শেখ মুজিব ও ব্রোহি দু’জনই আদালতে যেতেন, আর আদালতে চুপচাপ বসে থাকতেন, তামাশা দেখতেন।

সাক্ষীদের জেরা করা দূরের কথা, ব্রোহি আদালতে কথাই বলতে চাইতেন না। যদিও বা সাক্ষীদের এক-আধটা প্রশ্ন করতেন, সাক্ষীরা সেসব প্রশ্নেরও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারত না। মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে এসে শেখ মুজিবের পরিচিত এক ব্যক্তি শেখ মুজিবের দিকে তাকাতে পারে নি, আদালতে চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে ছিল। আদালতের কর্মকাণ্ড দেখে শেখ মুজিব মাঝে মাঝে মুচকি মুচকি হাসতেন। শেখ মুজিবকে মানসিক চাপে ফেলার জন্য জেলখানার যে সেলে তিনি বন্দী ছিলেন তার পাশের সেলে তার জন্য কবর খোঁড়া হচ্ছিল। ১৫ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের ফাঁসির আদেশ কার্যকরের আদেশ দেয়।

কিন্তু, এদিকে পূর্ব পাকিস্থানে তার অনুগত বাহিনীর আত্মসমর্পণের তোড়জোর শুরু হয়ে গেলে সে রেশ গিয়ে পড়ে পশ্চিম পাকিস্থানেও। আত্মসমর্পণ করার নানা উত্তেজনা আর দৌড়ঝাপের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ কার্যকর করতে দেরি হয়ে যায়। এই সুযোগে বঙ্গবন্ধু যে জেলখানায় আটক ছিলেন সেই জেলখানার জেলার বঙ্গবন্ধুকে জেলখানা থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। দুইদিন পর সেখান থেকে শেখ মুজিবকে চাশমা ব্যারেজ কলোনিতে সরিয়ে নিয়ে যান। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ২০ ডিসেম্বর পাকিস্থানের নতুন প্রেসিডেন্ট হয় জুলফিকার আলি ভুট্টো। ভুট্টো শেখ মুজিবকে মুক্তি দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। ভুট্টো বুঝতে পেরেছিল, শেখ মুজিবের কিছু হলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্থানি সৈন্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী বা জনতার একজনও সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারবে না।

তাছাড়া আন্তর্জাতিক নেতারাও শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বারবার পাকিস্থান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শেখ মুজিব ছিলেন পরিচিত মুখ। তার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও বাকপটুতা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হতে সাহায্য করে। এমনকি অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিকভাবে সহযোগিতাকারী সে সময়ে পাকিস্থানের ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকাও শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে পাকিস্থানের প্রতি অনুরোধ জানায়। ২৬ ডিসেম্বর শেখ মুজিবকে কলোনি থেকে হেলিকপ্টারে করে সিহালা অতিথি ভবনে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন ভুট্টো সেখানে এসে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে এবং তাকে মুক্তির সংবাদ দেয়। শেখ মুজিব জানান কামাল হোসেনও বন্দী আছেন, তাঁকেও যেন মুক্তি দেয়া হয়। পরের দিন কামাল হোসেনকেও সিহালা অতিথি ভবনে নিয়ে আসা হয়। ভুট্টো ০৭ জানুয়ারি রাত তিনটার সময় শেখ মুজিব ও কামাল হোসেনকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে বিমানে তুলে দেয়।

তথ্যসূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, একটি নির্দলীয় ইতিহাস – গোলাম মুরশিদ; ইন্টারনেট // https://muktirekattor24.com/public/news/1010005599