তোমার দেয়া পতাকা সমুন্নত থাকবে : প্রধানমন্ত্রী


অনলাইন রিপোর্ট : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে যে পতাকা উপহার দিয়ে গেছেন সেই পতাকা সমুন্নত থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তার জ্যেষ্ঠ কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।

এর আগে রাত ৮টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষের বছরব্যাপী অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের ভিডিও বার্তা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

দেশের সবাইকে মুজিববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুঃখী মানুষকে সুখী করার জন্য নিজের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছেন আমার বাবা। এ জন্যই তিনি মহামানব। তার সব সংগ্রাম-ত্যাগ ছিল দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। এটা করতে গিয়ে বারংবার কারারুদ্ধ হয়েছেন কিন্তু প্রত্যয় থেকে পিছিয়ে আসেননি।

ভাষণে করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মুজিববর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন সীমিত করার কথাও বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসজনিত উদ্ভুত পরিস্থিতিতে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছে। একই কারণে বিদেশি অতিথিবৃন্দের সফর স্থগিত করা হয়েছে। তবে বছরব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা মুজিববর্ষ উদযাপন করবো।

এসময় তিনি বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ভূটানের মহামান্য রাজা জিগমে খেসার নমগেয়েল ওয়াংচুক, নেপালের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারি, ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী, জাতিসংঘের মহাসচিব এন্টিনিও গুতেরাস এবং ওআইসি’র মহাসচিব ড. ইউসুফ আল ওথাইমিন-সহ বেশ কয়েকজন বিদেশি শুভাকাক্সক্ষী ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আমি তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন, আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ১৫ই আগস্টের শহিদদের প্রতি। স্মরণ করছি জাতীয় ৪-নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সকল শহিদকে। নির্যাতিত মাবোন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধাদের সালাম।

দেশবাসীকে উদ্দশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ ১৭ই মার্চ। ১৯২০ সালের আজকের দিনে এই বাংলায় জন্ম নিয়েছিলেন এক মহাপুরুষ। তিনি আমার পিতা, শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ নামের এই দেশটি তিনি উপহার দিয়েছেন। দিয়েছেন বাঙালিকে একটি জাতি হিসেবে আত্মপরিচয়ের মর্যাদা। তাইতো তিনি আমাদের জাতির পিতা।

তিনি বলেন, দুঃখী মানুষকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে নিজের জীবনের সব সুখ-আরাম বিসর্জন দিয়ে তিনি সংগ্রাম করেছেন আজীবন। বারবার কারারুদ্ধ হয়েছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করতো। অধিকারহারা দুঃখী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকারে তিনি দ্বিধা করেননি। এই বঙ্গভূমির বঙ্গ-সন্তানদের একান্ত আপনজন হয়ে উঠেছিলেন – তাই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনি আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই মানুষের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হতেন জাতির পিতা। অকাতরে বিলিয়ে দিতেন তাঁর জামাকাপড়, বই, ছাতা। যার যখন যা প্রয়োজন মনে করতেন, তাকে নিজের জিনিষ দিয়ে দিতেন। নিজের খাবারও তিনি ভাগ করে খেতেন। দুর্ভিক্ষের সময় গোলার ধান বিলিয়ে দিতেন। মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মধ্যেই তিনি আনন্দ পেতেন।

নিজের জীবনের কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না। বাংলাদেশের মানুষকে উন্নত, সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর সে ত্যাগ বৃথা যায়নি। আজকে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে মর্যাদার আসনে আসীন। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। গড়তে হবে জাতির পিতার ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

আজকের শিশু-কিশোর, তরুণ সমাজের কাছে আমার আবেদন – তোমরা দেশকে এবং দেশের মানুষকে ভালবাসবে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলার উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে তোমাদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। ঠিক যেভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মানুষকে ভালবেসেছিলেন, সেভাবেই ভালবাসতে হবে। তাঁর আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

এসময় তিনি জাতির পিতাকে উদ্দশ্য করে বলেন, পিতা, ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে তোমাকে। তোমার দেহ রক্তাক্ত করেছে। তোমার নাম বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওরা পারেনি। ঘাতকেরা বুঝতে পারেনি তোমার রক্ত ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে-বেয়ে ছড়িয়ে গেছে সারা বাংলাদেশে। জন্ম দিয়েছে কোটি কোটি মুজিবের।

বাংলাদেশের মানুষ জেগে উঠেছে উল্লেখ করে বলেন, আজ জেগে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষ সত্যের অন্বেষণে। ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। আজ শুধু বাংলাদেশ নয় তোমার জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশকে বিশ্ব চিনে নিয়েছে তোমার ত্যাগের মহিমায়।

শেখ হাসিনা বলেন, পিতা, তোমার কাছে আমাদের অঙ্গীকার, তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়বোই। আর সেদিন বেশি দূরে নয়। তুমি ঘুমিয়ে আছ টুঙ্গিপাড়ার সবুজ ছায়াঘেরা মাটিতে পিতা মাতার কোলের কাছে। তুমি ঘুমাও পিতা শান্তিতে। তোমার বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।

আমরা জেগে রইবো তোমার আদর্শ বুকে নিয়ে। জেগে থাকবে এদেশের মানুষ – প্রজন্মের পর প্রজন্ম – তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে। তোমার দেওয়া পতাকা সমুন্নত থাকবে চিরদিন। কবিগুরুর ভাষায় তাই বলতে চাই-

তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শকতি।
তোমার সেবার মহৎ প্রয়াস সহিবারে দাও ভকতি।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উদযাপনে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, আমি সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সবাইকে আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে আমি মুজিববর্ষের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।’#