রোহিঙ্গা ক্যাম্প করোনা ঝুঁকিতে


অনলাইন রিপোর্ট : উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদেশিদের বিচরণ। অধিক ঘনত্বে বসবাস। বেশির ভাগই অশিক্ষিত। আছে সচেতনতার অভাব। অনেকেই জড়িত মাদক পাচারসহ নানা অপরাধে। এর মধ্যে নিয়মিত আসা-যাওয়া বিদেশি এনজিওকর্মীদের। রয়েছে করোনা সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় স্থানীয় বাসিন্দারা।

ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। দেয়া হচ্ছে বিশেষ নজর। চিকিৎসার নিশ্চিত করা, আইসোলেশন ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের প্রদক্ষেপ সম্পূর্ণ হয়েছে।

৩৪টি ক্যাম্পে বসবাস ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। চিন্তিত প্রশাসনও। যদি একজন করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয় তাহলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। নিতে পারে ভয়াবহ রূপ। ক্যাম্পগুলোতে আরো কঠোর সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল।

কুতুপালং ক্যাম্পের নজির আহমেদ নামের একজন রোহিঙ্গা সাংবাদিকদের বলেন, বিদেশে করোনা ভাইরাস নামে একটা ভাইরাস হয়েছে বলে শুনেছি। বিভিন্ন দেশের মানুষ বিশেষ করে বিদেশিরা এখানে রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করছে। তাদের থেকে আমাদের কাছে যদি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তাই আমরা ভয়ে আছি। আমরা সুস্থ থাকতে চাই।

আব্দুল কাদির নামের আরেকজন বলেন, ভাইরাসের কথা শুনেছি তাই আমাদের ভয় লাগে। চিকিৎসকরা এখনো আমাদের বলেনি এটা হলে কী করতে হবে।

স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গারা মাঝে মধ্যে মিয়ানমার চলে যায়, আবার আসে। মিয়ানমার চীনের খুব কাছাকাছি। রোহিঙ্গারা লোকালয়ে আসছে তাই আমাদের ভয় লাগছে।

কক্সাবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেছেন, উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে যারা বিদেশিরা আছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছেন, তাদের সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আর ইতোমধ্যে আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের করোনা রোগীদের জন্য রামু ও চকরিয়ায় প্রস্তুত রেখেছি, খোলা হয়েছে ১০০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট।

আর সিভিল সার্জন ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা বিদেশিদের স্ক্রিনিং করছি। যা যা করা দরকার আমরা তাদের সেই পরামর্শ দিচ্ছি। শুধু কক্সবাজার নয়, চট্টগ্রাম জেলা এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ করোনা ঝুঁকিতে আছে, এন্ট্রি পয়েন্টেই যদি সংক্রমণকারীকে ঠেকিয়ে দেয়া না যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। এমন জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বী মিয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ-উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে চীন, জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিক অবস্থান করছে। সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে যুক্ত আছে অনেক দেশের কর্মকর্তা পর্যায়ের লোকজন।

তাদের অনেকের দেশেই করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তার লাভ করেছে। প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। এরপরও এসব বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে যাতায়াত অব্যাহত রয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও কর্মীরা বলছে, এখনো কক্সবাজারে অবস্থানরত বিদেশিরা তাদের নিজ দেশে নিয়মিত আসা-যাওয়া করছে। তারা ভাইরাস নিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এখনই কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে।

বিশেষ করে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ ভাইরাস ধরলে অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠবে। বেশ কয়েকটি এনজিওকর্মী জানিয়েছে, কিছুদিন পরপরই সুযোগ পেলেই বিদেশি নাগরীকরা নিজ দেশ গিয়ে কিছুদিন থাকার পর আবার বাংলাদেশে ফিরে আসছেন। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরকদের অবস্থাও একই।

এতে করে দেশের বিমানবন্দরে যতই থার্মাল স্ক্যানারে পরীক্ষায় করোনা শনাক্তের চেষ্টা করা হোক না কেন বিদেশিদের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস আসার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা ইস্যুতে কক্সবাজারে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকরা নিজ দেশে গেলে তাদের আর ফিরতে না দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

তারা চান পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যেসব বিদেশি নিজ দেশে যাবেন বা গেছেন, তাদের যেনো সেখানেই থাকতে বাধ্য করেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার জেলাপ্রশাসক মো. কামাল হোসেন এ বিষয়ে বলেন, নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতীত বিদেশিদের যাতায়াত না করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ইন্টারসেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সেখানে তাদের পক্ষ থেকে বিদেশিদের নিজ দেশে যাওয়া আসা নিয়ন্ত্রণের আশ্বস্ত করা হয়। আইএসসিজির মুখপাত্র সৈকত বিশ্বাস বিদেশিদের স্বদেশ যাতায়াতের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে বিদেশিদের নিজ দেশে যাতায়াত বন্ধ রয়েছে বলে দাবি তার।

সৈকত বিশ্বাস বলেন, করোনা ইস্যুতে এষড়নধষ অফারংড়ৎু মেনে চলবে বিদেশিরা। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, করোনা মোকাবিলায় সারা দেশের মতো কক্সবাজারেও নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তারই অংশ হিসেবে বিমান ও টেকনাফ স্থলবন্দরে জোরদার রয়েছে মেডিকেল টিম।

তিনি আরোও জানান, আকাশ ও নৌপথে আসা দেশি-বিদেশি সবাইকে করোনা ভাইরাস শনাক্তে থার্মাল স্ক্যানার বসানো হয়েছে। এতে দেশি-বিদেশি সকল যাত্রীকে থার্মাল স্ক্যানারে পরীক্ষা করছেন মেডিকেল টিমের সদস্যরা।

করোনার সম্পর্কে কক্সবাজার হোপ ফিল্ড হসপিটালের চিফ মেডিকেল অফিসার মো. ইসমাঈল ইদ্রিস বলেছেন, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো করোনা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়মিত বিদেশিদের বিচরণ রয়েছে এবং অধিক ঘনত্বে বসবাস।

তিনি মনে করেন, করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের নিয়ে দাতা সংস্থা ও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ঘনবসতির কারণে সেখানে করোনা আক্রান্ত হলে তা মারাত্মক আকার ধারণ করবে। এই প্রকোপ স্থানীয় কমিনিউটিতে ছড়িয়ে পড়বে।

এদিকে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মূলত চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। ওই সীমান্ত দিয়ে চীনের পণ্য সরাসরি মিয়ানমারে আসে। আর এসব পণ্য মিয়ানমার হয়ে বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশে ঢুকছে। এসব পণ্যের ট্রলারে আসছে মিয়ানমারের মাঝি ও নাগরিকরা।

এ কারণে টেকনাফ স্থলবন্দর ও করিডোরে মিয়ানমার থেকে আসা পণ্য ও পশু বোঝাই জাহাজ, ট্রলারের মাঝি, নাগরিকদের যাতায়াতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. টিটু চন্দ্র শীল বলেন, করোনা ভাইরাস ঠেকাতে সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি পেয়েছি।

এ নিয়ে জরুরি মেডিকেল টিমও গঠন করা হয়েছে। এই ভাইরাস শনাক্তে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়। এই মেডিকেল টিমকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই টিমে মেডিকেল অফিসার, উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার, নার্স ও ব্রাদার থাকবেন।

তবে স্থলবন্দর ও করিডোরে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি ও কাশির মতো সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালকে অবগত করতে বলা হয়েছে।

টেকনাফ স্থলবন্দর ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট ব্যবস্থাপক মো. জসীম উদ্দীন চৌধুরী জানান, করোনা ভাইরাস নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় বন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্দরে মেডিকেল টিমের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে বন্দরে ২০টির মতো মিয়ানমারের ট্রলার নোঙরে রয়েছে। এসব ট্রলারে অর্ধশতাধিক মিয়ানমারের নাগরিক রয়েছে।

তবে মিয়ানমার থেকে আসা নাগরিকদের ট্রলার থেকে বাইরে যাওয়ার কোনো ধরনের সুযোগ নেই। এসব নাগরিকরা যেনো দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে না পারে সে ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এছাড়া বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের কারণে প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে। গত কয়েক দিনে কমেছে পর্যটকের আসা-যাওয়া। হোটেলগুলো থেকে পর্যটকরা চলে যেতে শুরু করেছে।

অধিকাংশ হোটেলের অগ্রিম বুকিংও বাতিল হচ্ছে। ফলে ভর পর্যটন মৌসুমেও কক্সবাজার সাগর সৈকত ও কলাতলী হোটেল মোটেল জোনে পর্যটকদের গিজগিজ ভাব নেই।

ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, করোনার প্রভাবে পর্যটননির্ভর এই ব্যবসায় জড়িতদের পাশাপাশি দেশের পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৬০টি হোটেল রয়েছে। পর্যটন মৌসুমে গড়ে লক্ষাধিক পর্যটক এখানে অবস্থান করেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘পর্যটকদের মাঝে করোনা ভাইরাস ভীতি কাজ করছে। তাই বর্তমান সময়ে যে তুলনায় পর্যটক আসার কথা ছিলো সেই তুলনায় আসেনি। পাশাপাশি আগের কিছু কিছু বুকিংও বাতিল করে দিয়েছে অনেক পর্যটক।’

শুধু কক্সবাজার নয়, কারোনা ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে বন্দর নগর চট্টগ্রাম জেলা এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ বেশি ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বী মিয়া।

তিনি বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে। কারণ আমাদের দুটি বন্দর, একটি বিমানবন্দর ও অপরটি সমুদ্রবন্দর। দু’টি বন্দর দিয়েই সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এন্ট্রি পয়েন্টেই যদি সংক্রমণকারীকে ঠেকিয়ে দেয়া না যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না।’

ইতালিফেরত প্রবাসীদের কারণে চট্টগ্রামে ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। গতকাল সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ?‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২০’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ সব কথা বলেন।

শেখ ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, ‘আমাদের শাহ আমানত বিমানবন্দরে ইতোমধ্যেই থার্মাল স্ক্যানার বসানো হয়েছে। এ ছাড়া সমুদ্রবন্দরে হ্যান্ড থার্মাল স্ক্যানারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

করোনাদুর্গত এলাকার মধ্যে ইতালি থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রবাসী ফিরছেন। সাধারণত একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপসর্গ দেখা দিতে দুই থেকে ১৪ দিন সময় লাগে।

তাই বিমানবন্দরে স্ক্রিনিংয়ে করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তি বেরিয়েও যেতে পারে। এ সব কারণে আমরা বিমানবন্দর থেকে প্রতি মুহূর্তে আপডেট তথ্য নিচ্ছি এবং প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’#