পার্বতীপুরে ১০ টাকা কেজির চাল মৃত ব্যক্তির কাছে বিক্রি : অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ তদন্ত কমিটি গঠন


সোহেল সানী :
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হাবড়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের শওকত আলী (কার্ড নং ২৭৭) ও কফুরন (কার্ড নং ২২০) প্রায় চার বছর আগে মারা গেছেন। কাছাকাছি সময়ে মৃতবরন করেন একই ইউনিয়নের শেরপুর গ্রামের ইদ্রিস আলী (কার্ড নং ২৫০)। আর কিছু দিন পূর্বে ভবানীপুর গ্রামের লুৎফর রহমান (কার্ড নং ১৯৩) মারা যান।

সম্প্রতি, করোনাভাইরাসের সংক্রমনে কর্মহীন মানুষের মাঝে সরকারের খাদ্য সামগ্রী বিতরন কার্যক্রমে সুবিধাভোগেিদর তালিকা যাচাই-বাছাই করা হয়। এসময় এসব মৃত ব্যক্তির নামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্রের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ডের সন্ধান মেলে। এ খবর জানাজানি হলে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যান ওই সব গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত ব্যক্তিদের স্বজনরা। এনিয়ে ভূক্তভোগি এসব পরিবারের সদস্যরা সম্প্রতি এঘটনায় জড়িতদের বিচার ও শাস্তি দাবী করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করলে গোটা উপজেলায় হৈচৈ পড়ে যায়।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ডিলার ও ইউপি সদস্যদের যোগসাজশে মৃত ব্যক্তির নামে ১০ টাকা কেজি’ দরের চাল তুলে আত্মসাত করা হয়েছে। এঘটনায় জড়িতরা শুধু মৃত ব্যক্তির নামে চাল তুলে থেমে থাকেননি। তারা অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে জোতদার ব্যক্তির নামে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড প্রদান করেছে। এমনকি তালিকায় ভূয়া নাম ব্যবহার করে চাল উত্তোলন এবং তালিকায় নাম থাকা সত্বেও তাকে দীর্ঘ তিন বছর ধরে চাল না দিয়ে তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে চাল প্রদান করা হয়েছে।

এসব অনিয়মের শিকার হয়েছেন হাবড়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের (২নং ওয়াড) এহিয়ার আলী (৫০)। তার নামে তালিকা ও কার্ড বরাদ্দ থাকলেও ইউপি সদস্যা নাসরিন জাহান তার ঘনিষ্টজন একই গ্রামের সিরাজুল ইসলাম কে চাল দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ডিলারকে নির্দেশ দেন।

এহিয়ার আলীর নামে বরাদ্দ কার্ডের চাল কিভাবে অন্যজন পাচ্ছেন? এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাবড়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য (১,২ও ৩ নং ওয়ার্ড) নাসরিন জাহান নাম পরিবর্তনের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এহিয়ার চেয়ে সিরাজুল ইসলাম খাদ্য বান্ধব কর্মসূচীর সুবিধা পাওয়ার জন্য বেশী যোগ্য মনে করে আমি তালিকায় এহিয়ার আলীর নাম মুছে সিরাজুল ইসলামের নাম লিখে দিয়েছি।

প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে পাশের পলাশবাড়ী ইউনিয়নে। এ ইউনিয়নের হলদী দোলাপাড়া গ্রামের আব্দুস সালাম চেন্টু (কার্ড নং ৩৯৪) তালিকায় নাম আছে। কিন্তু চাল তুলছেন অন্যজন। তালিকায় একই গ্রামের তছলিমা নামে কার্ড (নং ৩৮৬) বরাদ্দ আছে। কিন্তু এ নামে ওই গ্রামে কেউ নেই বলে স্থানীয়রা জানান। অন্যদিকে, নওদাপাড়া গ্রামের সচ্ছল গৃরস্থ ওয়াজেদ আলী ১ একর ৮০ শতক জমির মালিক। হলদীবাড়ী দোলাপাড়া গ্রামের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে তাকে কার্ড (নং ২৪১) প্রদান করা হয়েছে। নওদাপাড়া গ্রামের মহুবার রহমান (কার্ড নং ২৭৪) ঢাকায় রয়েছেন দুই বছর ধরে। তার নামে বরাদ্দ চাল কে উত্তোলন করে কেউ জানে না। এসব ঘটনায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ডিলারা জড়িত বলে অভিযোগে দাবী করা হয়েছে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে হাবড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুজ্জামান বলেন, তার ইউনিয়নে ১ হাজার ৪৮৬ জনকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির চালের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ডিলার কোন রকম সমন্বয় না করায় সমস্যা হয়েছে। তালিকায় কিছু ভুলভ্রান্তি থাকার কথা স্বীকার করে তিনি দাবী করেন এর সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।

পার্বতীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ দেলোয়ার হোসেন সরকার বলেন, দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে গত ১৭ মে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

পার্বতীপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ হাফিজুল ইসলাম প্রামানিক বলেন, কোন মৃত ব্যক্তি, এছাড়া কোন ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি বা একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে তালিকাভুক্ত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। কেউ যদি এধরনের কোন ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করে থাকেন। তাহলে তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বতীপুর উপজেলা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনাজ মিথুন মুন্নী বলেন, তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এব্যাপারে কিছু বলা সমীচিন হবে না। #