নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না পদ্মা সেতুর কাজ


অনলাইন রিপোর্ট : করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে। এতে চারবার সংশোধনের পরও নির্ধারিত সময় আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত এই প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৭ শতাংশ। কিন্তু এখনো ক্ষতিগ্রস্তদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়াসহ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ করা যায়নি। এই সেতু তৈরির পর দেশের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি পিয়ার থেকে মাটি সরে যাওয়াসহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব কথা বলা হয়েছে খোদ সরকারি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদনে প্রকল্পের সবল ও দুর্বল দিকগুলোর পাশাপাশি সুযোগ ও ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের আলোকে কয়েকটি সুপারিশও করেছে আইএমইডি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের প্রভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রকল্প এলাকার ১৭ হাজার ৪৯২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পরিবারকে আইন অনুসারে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ৭টি পুনর্বাসন এলাকায় ২ হাজার ৯০৬টি প্লটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরই মধ্যে ২ হাজার ৬২৪টি প্লট হস্তান্তর এবং বাকিগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পুনর্বাসন বাবদ গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৯৫৭ দশমিক ৭৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুসারে, এপ্রিল পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ ও আর্থিক অগ্রগতি ৮৪ শতাংশ। একই সময়ে নদী শাসনকাজের অগ্রগতি ৭১ দশমিক ১ শতাংশ ও এ কাজের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৫ শতাংশ। অন্যান্য কাজ আগেই শেষ হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুসারে ২ হাজার ৬৯৩ দশমিক ২১ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা ছিল, যার জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৬৯৮ দশমিক ৭৩ কোটি টাকা। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩৪ দশমিক ৫৭ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৪৫৩ দশমিক ০৫ হেক্টর ভূমির দখল বুঝে নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।

আইএমইডি বলছে, করোনার কারণে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ আগামী জুনের মধ্যে এটি শেষ হচ্ছে না। সেতুটির কারণে পানিপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করা হলে পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া পদ্মা নদী অত্যন্ত খরস্রোতা বিধায় সেতুর পিয়ারের মাটি সরে গিয়ে গর্ত সৃষ্টি হতে পারে।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের সার্বিক কাজ সম্পাদন করার প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে কাজে কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছু এক্সপার্ট চীন গিয়ে আর আসতে পারেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে।’

আইএমইডি প্রতিবেদনে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি সবল দিক তুলে ধরে বলেছে, এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিক্ষা সহায়তা, সঠিক মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল, অর্থ বরাদ্দ ও ছাড়, বিভাগ ও মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক মনিটরিং এবং বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন অন্যতম। প্রকল্পের দুর্বল দিক সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত না হওয়ার আশঙ্কা, ভূগর্ভস্থ মাটি বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক সেগুলোর সেতুর পাইলের ডিজাইন পরিবর্তন করা, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার ফলে পুনর্বাসন কার্যক্রমে বিলম্ব ও অধিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা।

এ বিষয়ে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই এটি বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হবে। প্রতিবেদনে সেতুর বাস্তবায়ন, সেতুর টোল আদায়ে আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন, ভবিষ্যতের নিরাপত্তায় এক্সেল লোড মিটার স্থাপনসহ বেশ কয়েকটি কাজের সুপারিশ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুর কাজের জন্য যা ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। আশা করি, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও বিভাগের এটি উপকারে আসবে।’

প্রকল্পের বেশ কয়েকটি সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আইএমইডি বলেছে, এর মধ্যে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা; প্রকল্প এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ; প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ; উন্নত শিক্ষালাভের সুযোগ; স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ ছাড়াও বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডের ফলে জনগণের আয় বৃদ্ধি অন্যতম।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি সড়ক ও রেলযোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে পদ্মা সেতুর কাজ হাতে নেয় সরকার। ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর ফলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

১৯৯৯ সালে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে (জিওবি) প্রকল্পটির প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। পরে ২০০৩-০৫ সালে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) মাধ্যমে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পটির মূল ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল। প্রকল্পের প্রধান কাজ ছিল ভূমি অধিগ্রহণ, ১২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ, সার্ভিস এরিয়া-১ নির্মাণ, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সড়ক, রেল সেতু নির্মাণ, ১৪ কিলোমিটার নদীশাসন, ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট এবং সেফটি, কন্সট্রাকশন সুপারভিশন, পুনর্বাসন, পরিবেশগত কার্যক্রম ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট।

প্রকল্পটির ডিপিপি ২০০৭ সালে ১০ হাজার ১৬ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৪-১৫ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রণয়ন করা হয়। পরে ২০১১ সালে ২০ হাজার ৫০৭ দশমিক ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ডিসেম্বর ২০১৫ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রথম এটি সংশোধন করা হয়। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। পরে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দর অনুযায়ী প্রকল্পটির ডিপিপি ২৮ হাজার ৭৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ সময়কালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বার সংশোধন করা হয়। কাজ শেষ না হওয়ায় ২০১৮ সালে মেয়াদ বৃদ্ধি ব্যতিরেকে অতিরিক্ত ১ হাজার ১৬২ দশমিক ৬৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের কারণে বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ১৯ কোটি টাকায়। পরে ২০১৯ সালে আবারও ডিপিপি সংশোধন করা হয়। ওই সময় ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ভৌত কার্যক্রম ৮টি প্যাকেজে বিভক্ত। পরিবেশ ঝুঁকির বিষয়ে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদার কর্র্তৃক নিয়োজিত একজন সিনিয়র পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রকল্প এলাকার পরিবেশগত বিভিন্ন দিক মনিটর করেন এবং প্রতি মাসে প্রতিবেদন প্রদান করে থাকেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃক চুক্তি মোতাবেক ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশ অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা ঠিকাদার কর্র্তৃক মনিটরিং করা হয়। ঠিকাদার কর্র্তৃক প্রকল্প এলাকায় কর্মরত শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি একজন পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ নিয়মিত তদারকি করে থাকেন এবং তিনিও প্রতিবেদন প্রদান করে থাকেন। #