কুড়িগ্রামে বন্যায় আড়াই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী : ধরলার পানি বিপদসীমার ১০২ সেন্টিমিটার উপরে


মোস্তাফিজুর রহমান,কুড়িগ্রাম :
অবিরাম বর্ষণ ও গজলডোবা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেয়ায়, ভারতীয় পানি হু-হু করে আসছে দেশের উত্তর সীমান্ত কুড়িগ্রামের উপরদিয়ে বয়ে যাওয়া সকল নদ-নদীর উপর। ফলে কুড়িগ্রামের সবকটি নদীর পানি ফুলে-ফেপে টইটুম্বুর হয়ে উঠেছে। এরইমধ্যে ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় হুহু করে বানের পানি ঢুকছে লোকালয়ে। ৯ উপজেলার ৫৬টি ইউনিয়নের প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন আড়াই লক্ষাধিক মানুষজন।

এদিকে ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবরী জেলার মাইনকারচর এলাকার কালো নদীদিয়ে ঐ দেশের পাহাড়ী ঢল, কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সীমান্তঘেষা ঝিন্জিরাম নদীতে তীব্র গতিতে প্রবেশ করায় টইটুম্বুর হয়েছে ঐ এলাকা। এতে আতংকিত হয়ে পড়েছে নদী পাড়ের মানুষজন। তলিয়ে গেছে রৌমারী সদরের ঠনঠনিয়াপাড়া, চুলিয়ারচর, নওদাপাড়া, খাটিয়ামারী, ব্যাপারীপাড়া, রতনপুর, মোল্লারচর, যাদুরচর ইউনিয়নের চাক্তাবাড়ী, দিগলপাড়া, নতুনগ্রাম, ধনারচরসহ ঐ উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ও শৌলমারী ইউনিয়নের আরো ৫০ গ্রামসহ প্রায় শতাধিক গ্রামের ৮’শতাধিক পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ। এতে ঐ এলাকার রোপা আমন বীজতলাসহ অন্যান্য ফসলের প্রায় ৭’শ হেক্টর জমির ফসল পানির নীচে নিমজ্জিত হয়েছে।

ফুলবাড়ী উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রায় ২হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েপড়েছে।উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা, বেগমগন্জ, বজরা, থেতরাই, হাতিয়া ও বড়াবুড়িসহ তবকপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় নতুন করে পানি ঢুকে পড়েছে।প্রবল স্রোতের তোড়ে সেখানকার বেশকিছু ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে এবং সব ভেসে যাচ্ছে। নিম্নাঞ্চলসমূহের বাড়িঘর তলিয়ে গিয়ে ১ম দফা বন্যায় কিছুটা ক্ষতি হলেও এবার কোন কিছুই রক্ষা করতে পারছেন না এসব মানুষ। অপ্রতুল ত্রাণ সকলের ভাগ্যে জুটছে না বলে অভিযোগ বন্যার্তদের।

নিজেদের সহায় সম্বল বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ায় তারা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। হাঁস, মুরগী, গরু ছাগলসহ গবাদি পশু ও ঘরের ধান চালসহ অনেক জিনিস বন্যার পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। কাঁচা সড়ক ছাড়াও সদর উপজেলার মধ্যকুমরপুর এলাকায় পাকা রাস্তায় পানি উঠেছে। ফলে এখানকার বাজারে আসা মানুষজনের কষ্ট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চর থেকে নৌকা নিয়ে পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে নৌকায় নিজেদের মালামাল নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসছে বানভাসীরা। এখনও অনেক এলাকায় বানভাসীদের ত্রাণ হাতে না পৌঁছায় বন্যার্তরা ক্ষোভ জানিয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, কুড়িগ্রাম ধরলা সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১০২ সেন্টিমিটার, তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার, ব্রক্ষপুত্রের নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৫ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার উপরদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পরিস্থিতির অরো অবনতির আশংকা

ধরলা নদীর পানির প্রবল চাপে সোমবার সদর উপজেলার সারডোবে একটি বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

সদর উপজেলার মধ্যকুমরপুর হয়ে ফুলবাড়ী উপজেলা শহর যাওয়ার পাকা রাস্তা এখন পানির নিচে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। হলোখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উমর ফারুক জানান, ধরলা নদীর পানির প্রবল চাপে সদর উপজেলার সারডোবে একটি বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

সারডোব গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, সোমবার সকালে বাঁধটি ভেঙে পানি প্রবল বেগে ধেয়ে আসে। একে একে ৫টি বাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং অনেক মালামাল ভেসে যায়। তীব্র স্রোতের কারণে নৌকা নিয়ে সেখানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হলোখানা ইউপি সদস্য জানান, বাঁধটি ভাঙার ফলে হলোখানা, ভাঙামোড়, কাশিপুর, বড়ভিটা ও নেওয়াশি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম একে একে প্লাবিত হচ্ছে।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ময়নুল ইসলাম জানান, পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধারের জন্য সেখানে দু’টি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া জেলায় ৪৩৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তত রাখা হয়েছে। ৪০০ মে. টন চাল, ১১ লাখ টাকা ও ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছজেলা থেকে উপজেলাগুলোতে প্রায় সাড়ে হাজার মেট্রিক টন চাল, ৪ লক্ষ টাকা, ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবারের প্যাকেট, শিশুদের খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা ও গো-খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও এখনো তা বিতরণ শুরু হয় নাই। এ দিকে প্রথম বন্যায়, বানভাসী মানুষজনের সঞ্চিত খাদ্য ও অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো পড়েছেন মারাত্মক বিপাক।