ডিমলার সংঙ্গীতশিল্পী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি শ্যামল চন্দ্র একটি ঘর ও দোতারা পেলেই চির সুখী আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে


আসাদুজ্জামান পাভেল, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি ঃ মায়ের কান্দন, যাবজ্জীবন দুই চার মাস বোনের কান্দন, ঘরের পরিবারের কান্দন, কয়েক দিন পর থাকে না, দুখের দরদী আমার জনম দুখী মা, গর্ভধারনী মা, জনমও দুখীনি মা, দুখের দরদী মা। ১০মাস ১০দিন মায়ে গর্ভে দিছে ঠাই, রক্ত মাংস খাইয়া মায়ের ভবে আইলাম ভাই, ভূমিষ্ট হইলাম আমি উঠিলাম কান্দিয়া, শান্ত করিলে মায়ে বুকের দুধো দিয়া। মায়েরও প্রসবও কালে, সুখ ভিজে নয়নের জলে, সন্তানেরে লইয়া কোলে ভুলে প্রসব যন্ত্রনা, দুখের দরদী মা, আমার জনমও দুখীনি মা। এই গানের সুরে মায়ের ও নিজের দুখের কথা জানালো এভাবে ক্ষুদে সংগীতশিল্পী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি শিবু রাম চন্দ্রের পুত্র শ্যামল চন্দ্র রায়।

ভাংগা দোতারায় ছেড়া তাঁরে সুর তুলে যখন মায়ের এ গান গেয়ে চলেছে ক্ষুদে এ শিল্পী পাশেই বসা মা দু’নয়নে অশ্রু ছেড়ে দিয়ে নিথর দেহে তাকিয়ে আছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি এ শিল্পীর দিকে। ৮ আগষ্ট বিকালে আমরা কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী খোঁজ খবর নিতে ছুটে যাই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কেমন আছে ক্ষুদে শিল্পী শ্যামল চন্দ্র ! ছিন্নকুঠিরে একটি ঘড় অন্যটি পুরাতন টিনের চালা ঘরে বসবাস করছে বাবা-মায়ের সাথেই এই শিল্পী। আমাদের আগমনে চোখে দেখতে না পেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এসেই জিজ্ঞেস করে কারা আপনারা ? কি চান ? কোন গান রেকডিং করার জন্য কি এসেছেন ? আরো কত প্রশ্ন। উত্তরে বলে উঠি না তেমন কিছু না। আমরা দেখা করতে এসেছি কেমন আছো তুমি। কেমন যাচেছ দিনকাল ? কিভাবে কাটছে দিন ? কথা শুনেই বেশ কিছু গান শুনিয়ে বললো আমি বরই কষ্টে আছি, বেশ কয়েক মাস ধরে বাইরে যাইনা গানও গাই না। উপার্জন নেই। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে আমার। বাবা-মায়ের কিছু নেই কিভাবে চলবে আমাদের জীবন ? কেন এবার করোনাকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুদান কি পাওনি তুমি ? উত্তরে শ্যামল জানালো না, পাইনি। তবে আমি কিছু দিন পূর্বে ঈদের আগে বাবাকে নিয়ে ডিসি অফিস গেছিলাম, কাগজপত্র জমা দিয়ে আসছি। বেশ কিছুদিন ধরে ডিমলা সালাম স্যারকে ফোন দিছি বলছিলে এখনও কিছু আসেনি আসলে তোমাকে জানানো হবে। তারপর থেকে আর আমি কিছুই জানি জানি না। এসব কথা শুনে আমরা (গণমাধ্যমকর্মী) বল্লাম, তোমার নামে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ অনুদানের টাকা বরাদ্দ হয়েছে। গত ৫ আগষ্ট তা ১২ জন অসচ্ছল সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে চেক বিতরণ করা হয়েছে। তুমি পাওনি। কথাগুলো শুনে আঁতকে উঠে অসহায় অসচ্ছল মানবেতর জীবন যাপনকারী শ্যামর চন্দ্র বিমর্ষ হয়ে পড়ে। তাৎক্ষনিক সে (শ্যামল চন্দ্র) ডিমলা মিউজিক ভুবনের সভাপতি সংগীত শিল্পী ও অভিনেতা আব্দুস সালামকে মুঠোফোনে জানতে চায় ঐ টাকার বিষয়ে মুঠোফোনে তিনি ( আব্দুস সালাম) জানান, তোমার টাকা আছে তুমি আগামীকাল ( রোববার) ইউএনও স্যারের সাথে দেখা করে টাকা নিয়ে যেও। এ খবর পেয়ে আনন্দে ফেটে পড়া শ্যামল চন্দ্র একই সময়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায়ের মুঠোফোনে ফোন করা মাত্রই অপর প্রান্ত থেকে ইউএনও স্যার বলে উঠেন ( শ্যামল কিছু বলার পূবেই) হ্যা শ্যামল কেমন আছো। তোমার টাকা আমার কাছে আছে তুমি জান না ? উত্তরে শ্যামল চন্দ্র বলে আমি তো জানি না। ঠিক আছে তুমি কাল (রোববার) আমার অফিসে এসে টাকা নিয়ে যাও। তিনি ( ই্উএনও) আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেওয়া বিশেষ অনুদান তোমাকে দেওয়া হয়েছে। তোমার টাকা আমার কাছে জমা আছে তুমি এসে নিয়ে যাও। ফোন রেখে দেওয়া মাত্রই আনন্দঅশ্রু ঝড়তে থাকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি এই শিল্পীর চোখে। যেন সে আকাশ হাতে পেলো। মনের আনন্দে বলেও উঠলো টাকাটা পেলে মা-বাবাকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ভালো ভাবে খেতে পারবো।

এসময় তার গর্ভধারীনি মা জানালো, আমার তিন সন্তানের মধ্যে শ্যমল ছোট। খুব ছোট বেলায় ওর জ্বর হয়। তিব্র জ্বরে আর শরীরের কাপুনীতে কি থেকে কি হয়ে গেল আমার ছেলে ধীরে ধীরে চোখের আলো হারিয়ে ফেললো। ছোট বেলা থেকেই সে দোতারা দিয়ে গান গাইতো। চোখের দৃষ্টি চলে যাওয়ার পর থেকে গানেই তার জীবন সাথী হয়ে গেছে। খেয়ে না খেয়ে বিভিন্ন সুরে যে কোন গান একবার শুনেই সে গাইতে পারে স্কেলে। কথার ফাঁকে ক্ষুদে এই শিল্পী গণমাধ্যম কর্মীদের জানায়, আমার দোতারাটা অর্থাভাবে কিনতে পারিনি। ছোট বেলার এই দোতারাটা ভেংগে গেছে প্রায়। তার কথা শুনা দেখা গেল দোতারায় একটি তার সুতা, দুইটি তার রাবার আর একটি তার গুনা দিয়ে টানানো আছে। প্রশ্ন করলাম দোতারার এই অবস্থা কেন ? টাকা নাই কিনতে পারিনি গানের সুর তোলা এই দোতারাটা। ৫/৬ হাজার টাকা হলেই আমার জন্য একটি ভালা দোতারা হয়। কোথায় পাবো এই টাকা। দুইটি ঘরের মধ্যে এটি থাকে গরু আর অন্যটিতে আমরা (বাবা-মা ও আমি)। তাই আপনাদের মাধ্যমে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাবো যদি আমার মাথা গোজার ঠাঁই এর জন্য একটি ঘর আর সাথে দোতারাটি দিয়ে দিতো তাহলে আমি জনম দুখী অধম চোখের আলো হারানো অন্ধ এই প্রতিবন্ধি চির সূখী হতাম। তিনি তো অনেককে অনেক ভাবেই সুখী করেছেন। আমাকে না হয় এই একটি ঘর আর দোতারাটা উপহার দিয়ে সুখী করবেন। আমি সারা জীবন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য দু’হাত তুলে ভগবানের কাছে প্রার্থন করবো। আর জীবনের বাকীটা সময় সেই দোতারায় সুর তুলে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে দিনাতিপাত করবো। তাহলে আমার আর কোন দু:খ থাকবে। আমি হব বাবা-মায়ের সাথে চিরসুখী।

উল্লেখ্য, গত ৫ আগষ্ট বুধবার নীলফামারীর ডিমলায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ জনিত কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে অসচ্ছল সংস্কৃতি শিল্পীদের মাঝে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুদানের ৬০ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায়ের সভাপতিত্বে সংস্কৃতিসেবীর মাঝে ৬০ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়। উক্ত চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর মোঃ আল কামাহ তলাম, বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থার ডিমলা উপজেলা শাখার সভাপতি বৈদাস চন্দ্র রায়, সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাইফুল ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক মিলন রায়, ডিমলা মিউজিক ভুবনের সভাপতি আব্দুস সালাম, ডিমলা সংগীত ভুবনের পরিচালক আমিনুর রহমান উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সংস্কৃতিসেবীগণ। এ সময় ১২ জন অসচ্ছল সংস্কৃতিসেবীদের হাতে প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। #