পার্বতীপুরে দোকান নিয়ে সংঘর্ষের স্কুল ছাত্রী পা ভেঙ্গে দিয়েছে ভাড়াটিয়া : মামলা তুলে নিতে হুমকি

নিজস্ব প্রতিনিধি : দিনাজপুরের পার্বতীপুরে হরিরামপুর ইউনিয়নের খয়েরপুকুর হাটে হাটচান্দিনার প্রবাসী সাহেব আলীর ক্রয়কৃত একটি দোকান ঘরে নিয়ে হামলা ও মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। প্রবাসী সাহেব আলীর পরিবার ভাড়াটিয়াকে ঘর ছেড়ে দেয়ার নোটিশ দেয়ার কারনে ৯ম শ্রেণির স্কুল ছাত্রীকে মারপিট করে পা ভেঙ্গে দিয়েছে। তাকে রক্ষা করতে গেলে একজন প্রতিবন্ধিসহ আরও দু’জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় উভয় পক্ষে থানায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় হাট এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন মূহুর্তে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশংকা দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, মালয়েশিয়া প্রবাসী সাহেব আলী (৬২) পিতা মৃত আব্দুল হালিম গ্রাম দক্ষিন হরিরামপুর (পশ্চিম পাড়া), খয়েরপুকুর হাটের হাট চান্দিনার একটি দোকান ঘরের পজেশন ক্রয় করেন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর উপজেলার পূর্ব হোসেনপুর গ্রামের মৃত ময়েজ উদ্দিনের পুত্র মোবারক আলী, মনিরুজ্জামান, হাবিবুর রহমান, হাফিজুল ইসলাম ও মোশারফ হোসেনের কাছে দোকান ঘরের পজেশন বুঝে নিয়ে সার ও কীটনাশক ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা শুরু করার সময় তিনি হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মেসার্স ছায়মা ট্রেডার্স এর নামে ট্রেড লাইসেন্স করেন।

প্রবাসী সাহেব আলীর স্ত্রী মোছাঃ রোখসানা বেগম (৪৫) বলেন, স্বামী বিদেশ থাকায় ৮ মাস আগে তার দোকান ঘরটি উত্তর বিষ্ণুপুর গ্রামের মৃত আছমতুল্যার পুত্র আবদুল হাকিমের কাছে ভাড়া দেই। দুই মাস আগে তাকে ঘরটি ছেড়ে দিতে বলি। গত ১১ জুলাই দুপুরে আমার স্কুল পড়–য়া মেয়ে মোছাঃ শান্তা মনি (১৪), প্রতিবন্ধি ভাই আব্দুল মালেক (৪২) ও চাচাতো ভাই আব্দুল মজিদকে (২৫) নিয়ে খয়েরপুকুর হাটে আমাদের দোকানের ভাড়াটিয়া আব্দুল হাকিমের কাছে যাই। সেখানে দোকান ঘরটি ছেড়ে দেয়ার কথা বলা মাত্র আব্দুল হাকিম তেলে বেগুণে জ্বলে ওঠে বলেন, দোকান আমি ৭ লাখ টাকায় সাহেব আলীর বড় ভাই আতাউরের কাছে কিনে নিয়েছি। এ সময় সে তার লোকজনদের হুকুম দেয় আমার মেয়েকে মেরে ফেলার জন্য। তার নির্দেশে হানিকুল ইসলাম (৪০), হাইকুল ইসলাম (২৬) ও নুরুন্নবীসহ ৫/৬ জন সন্ত্রাসী আমার মেয়েকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে রড, লাঠি নিয়ে হামলা করে। এক পর্যায়ে তারা মেয়ের একটি পায়ের গোঁড়ালি ভেঙ্গে ফেলে। মেয়েকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে আমার প্রতিবন্ধি ভাই মালেক ও চাচাতো ভাই মজিদকেও তারা মারপিট করে। সংবাদ পেয়ে পুলিশ এসে আহতদের উদ্ধার করে পাশের বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। পরদিন ১২ জুলাই আমি পার্বতীপুর মডেল থানায় হাজির হয়ে ৪ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করি। এদিকে, একই ঘটনায় আব্দুল হাকিমের ভাতিজা তারাজুল ইসলাম (৪০) বাদী হয়ে গত ১৪ জুলাই পর্বতীপুর মডেল থানায় ১১ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। সাহেব আলীর বড় ভাই আতাউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে বলেন, দোকান ছোট ভাইয়ের, কিন্তু বিক্রি করেছি আমি। কেন, কি কারনে এমন কাজ করেছেন জানতে চাইলে নীরব থাকেন। আব্দুল হাকিম তাঁকে ৪ লাখ টাকা দিয়ে ৭ লাখ টাকার স্ট্যাম্প করে নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। দোকান ভাড়াটিয়া আব্দুল হাকিম বলেন, আমি পজেশন নিয়েছি আতাউর রহমানের কাছে। সেটি সঠিক না বেঠিক হয়েছে তার জবাব দেবে আতাউর রহমান । তবে দোকান নিতে এ যাবত তার ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসময় তিনি ৩০০ টাকার নন জুিডশয়াল স্ট্যাম্পে আতাউর রহমান স্বাক্ষরিত কাগজটি এ প্রতিনিধিকে দেখান। তবে এর ফটোকপি চাইলেও দেননি। প্রতিবন্ধি মোতালেব বলেন, সাহেব আলী ও আতাউর রহমান উভয়ে আপন ভ্রাতা। উভয়ে আমার আপন ভগ্নিপতি। দোকান ঘরটি আমার ছোট ভগ্নিপতি সাহেব আলীর। ষড়যন্ত্র করে সেই ঘরটি আতাউরের কাছে লিখে নিয়েছে আব্দুল হাকিম। আর ষড়যন্ত্রকারীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন ১নং ওয়ার্ডের মেম্বর জাহাঙ্গীর আলম জুয়েল। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে হোসেনপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোস্তম আলী, খয়েরপুকুর হাট সবুজ সাথী হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক মোশারফ হোসেন এবং মোসলেম উদ্দিন, রওশন আলী ও আমুর নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন। তারাজুল ইসলামের দায়ের করা মামলাটিও পুরোপুরি ষড়যন্ত্রমূলক বলে উল্লেখ করেন তিনি। মামলায় সাহেব আলীর পরিবারের সকলকে আসামী করা হয়েছে। তার মধ্যে প্রতিবন্ধি দুই ভাই, সাহেব আলীর স্ত্রী, মেয়ে ছায়মা ও জামাই সুমন কাউকে বাদ দেয়া হয়নি।

প্রবাসী সাহেব আলী সম্প্রতি সাবেক মন্ত্রী ও আমাদের নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্যকে মোবাইল করে সব কথা বলেছেন। এ সময় তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন, তোমার দোকান ঘর তোমারই থাকবে। এ কথা সাহেব আলীর মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি।

এ ব্যপারে জানতে চাইলে জুয়েল মেম্বার এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। মামলা হওয়ার পর মোতালেব আমাকে জানিয়েছে দোকানের পজেশন বিক্রির কথা। হোসেনপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোস্তম আলী বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণরুপে মিথ্যা।

হরিরামপুর ইউপি চেয়ারম্যন মাসুদ শাহ্ বলেন, সাহেব আলীর স্ত্রী রোখসানা বেগম ইউনিয়ন পরিষদে বিচার প্রাথীর্ হলে দুই পক্ষকে গ্রাম আদালতে হাজির থাকতে বলা হয়। কিন্তু বিবাদী পক্ষ গরহাজির থাকেন। সব কাগজপত্র পর্যালোচনা ও তদন্ত করে বাদীকে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের শরনাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও, এ প্রতিনিধিকে বলেন, আব্দুল হাকিম কিছুতেই এ ঘর পেতে পারে না। সাহেব আলীর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র রয়েছে।

হাট ইজারাদার শাহ আলম শাহ বলেন, আমি আব্দুল হাকিমকে সাহেব আলীর দোকান ঘর নিতে নিষেধ করেছি। বলেছি টাকা পয়সা নষ্ট করে জঞ্জাল কিনে নিও না। হাটের ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা আলহাজ্ব ডাঃ আব্দুর রহিম বলেন, সমস্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করলে ঘর সাহেব আলীই পাবেন বলে মনে করি ।

মোছাঃ রোখসানা বেগম ও তারাজুল ইসলামের দায়ের করা দুই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হুসাইন কবীর বলেন, মামলার তদন্ত চলমান আছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগাম কিছু বলা যাবে না। তবে এটুকু বলতে পারি একজনের দোকান আরেকজন বিক্রি করতে পারেন না। ভাই, স্ত্রী কেউ না।

এদিকে সাহেব আলীর শ্যালক প্রতিবন্ধী মোতালেব হোসেন গত ১০ আগষ্ট সন্ধ্যায় খয়েরপুকুর হাট থেকে বাড়ীতে যাবার পথে ভাড়াটিয়া আঃ হাকিমসহ ৪ব্যক্তি তাকে রাস্তায় আটক করে উক্ত মামলা তুলে নেয়ার জন্য হুমকি দেয়। এ জন্য আমি নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছি।

শাহাজুল ইসলাম