আজ নতুন বছরের ১৩৮৬ হিজরীর পহেলা মুহাররম


আপনাদের পহেলা মুহাররম কি বছরের অন্য দিনগুলোর মতোই কাটে? অথচ এইদিনের প্রভাতে একটি নতুন বছরের জন্ম হয়। এই রাত পার হলে একটি দীর্ঘ বছরের সমাপ্তি হয়!

মুসাফির তার পথের একটি মানযিল অতিক্রম করে একটু থামে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে, কতটুকু পথ সে অতিক্রম করেছে, আর কতটুকু বাকি।
ব্যবসায়ী তার বছর শেষে মালের হিসাব করে। দেখে, এক বছরে কী পরিমাণ লাভ হয়েছে কিংবা কোনো লোকসান হয়েছে কিনা।
নববর্ষ একটি নতুন স্টেশন। জীবনের পথ চলতে গিয়ে আমরা এখানে একটু থামি। বুঝতে পারি, জীবন থেকে আরও একটি বছর চলে গেছে! এখানে এসে আমরা কি একটু হিসাব মেলাব না! একটু কি ভাবব না?

আজ ১৩৮৬ হিজরীর পহেলা মুহাররম। (এটি ৫৬ বছর আগের কথা। লেখক সেই সময় লেখাটি লিখেছেন। বর্তমানে শুরু হচ্ছে ১৪৪২ হিজরী।Ñঅনুবাদক) সকালে দেখব পূর্ণ একটি দিন আমাদের সামনে। এদিনে আমরা যেকোনো কাজ করতে চাই, পারবো। চাইলে দুনিয়া থেকে উপভোগ করতে পারব। চাইলে আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয় করতে পারব। কিন্তু যখন দিন পার হয়ে সন্ধ্যা আসবে, চাইলেও এই দিন থেকে কিছু অর্জন করা যাবে না। কোনো ভোগ-উপভোগও সম্ভব হবে না।
আমরা ভাবি, পুরো দিন বাকি। তাই কিছু সময় অপচয় করি। সম্পদ অপচয়কারী যেভাবে সম্পদ নষ্ট করে আমরাও সেভাবে আমাদের সময় নষ্ট করি। আমরা ভুলে যাই, চাইলেও এই সময় আর পাওয়া যাবে না। যে সময় চলে যায় তা কোনোভাবেই ফিরে আসে না। গত বছরের পহেলা মুহাররমের কথা স্মরণ করুন। সেদিন সকালেও ভেবেছি, সামনে আমাদের দীর্ঘ সময়। চাইলে সেই সময়েও অনেক কাজ করা যেত। কিন্তু আজ কোথায় সেই দিন? কোথায় তার আগের বছরের পহেলা মুহাররম? কোথায় আমাদের অতীত জীবনের পহেলা মুহাররমগুলো?

দিনগুলো আমাদেরকে অতিক্রম করে চলে গেছে। আমরা চলে এসেছি দিনগুলো ছাড়িয়ে। কিন্তু আমাদের হাতে কী ফলাফল অবশিষ্ট আছে?
এক বছর চলে যায় আরেক বছর আসে। আগের বছরটিকে পেয়ে যে ব্যক্তি লাভবান হতে পারেনি পরের বছর থেকে যেন সে লাভবান হয়। দিনের বেলা যদি কোনো নেক কাজ করার সুযোগ না হয়, সামনে রাত আসছে। সেসময় নেক কাজ করুন। মৌসুমের পর মৌসুম আসছে। আগেরটিতে যদি ফসল বুনতে না পারেন পরের মৌসুমে বুনেন। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় যদি আপনি অকৃতকার্য হন দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা আছে আপনার সামনে।
এভাবে আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন একের পর এক সুযোগ আসতে থাকবে। কিন্তু আপনার তো জানা নেই কতদিন বেঁচে থাকবেন!

আজ আমি আমার একটি বই থেকে একটি প্রবন্ধ পড়লাম। সেটি ১৯৩৭ সনের শুরুতে ছেপেছিল। প্রবন্ধটির শিরোনাম, ত্রিশের দরজায় দাঁড়িয়ে। সেদিন যদি আমি কল্পনা করতাম, লেখাটি ১৯৬৬ সনের শুরুতে পড়ব, তাহলে মনে হতো দীর্ঘ ২৮ বছর পর! কিন্তু আজ সেই ২৮ বছর পার হওয়ার পর লেখাটি পড়লাম। মনে হচ্ছে যেন মাত্র একদিন একরাত পার হয়েছে!
আজ যদি সামনের ২৮ বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের দিকে তাকাই—মনে হবে কতো দূর! কিন্তু সে দিন যদি কেউ আজকের লেখাটি পড়ে—মনে হবে এই কয়েকদিন আগের লেখা!

একবারের কথা। আমি আমার ছোট ভাইকে নিয়ে বৈরুত থেকে জেদ্দার উদ্দেশে সফর করছিলাম। বিমানবন্দরের হোটেলে বসে নাস্তা করছি আর অপেক্ষা করছি। হোটেল ভর্তি মানুষ। প্রত্যেকেই খাওয়া দাওয়া আর কথাবার্তায় মগ্ন। তুমি তাদেরকে দেখলে মনে হবে তারা একে অপরের ঘনিষ্ট বন্ধু। তারা কখনো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। তাদের এ ঐক্য কখনো ভাঙ্গবার নয়। কিন্তু সেই বিমানবন্দরে প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর অন্তর একটি করে বিমান নামে, একটি উড়ে। স্পিকারে ঘোষণা হলো—বিমান (BOAK) অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই লন্ডন অভিমুখে রওয়ানা হচ্ছে। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একদল মানুষ খাওয়া দাওয়া রেখে ছুটে গেল।
এরপর ঘোষণা হলো—জাকার্তাগামী বিমান কেএলএম অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই রওয়ানা হচ্ছে। অমনি একদল মানুষ খাওয়া দাওয়া ছেড়ে উঠে গেল।
আরেকটি বিমান রওয়ানা হচ্ছে আমেরিকা অভিমুখে। আরেকটি কঙ্গো অভিমুখে। আরেকটি ইরান অভিমুখে। আরেকটি মস্কো অভিমুখে।
মানুষের এই অবস্থা দেখে আমি আমার ভাইকে বললাম, এই হলো আমাদের জীবন। আমরা খাওয়া দাওয়া এবং নানা ভোগ ও উপভোগে মগ্ন। এরইমধ্যে হঠাৎ ঘোষকের ডাক আসছে। এরপর কেউ চলে যাচ্ছে আফ্রিকার বনে। কেউ সাইবেরিয়ার বরফে। কেউ প্যারিসের পার্কে। কেউ নিউইয়র্কের পর্যটনকেন্দ্রে।
যে ব্যক্তি সফরের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করেছে। জিনিস-পত্র গুছিয়ে নিয়েছে এবং তার বোঝা হালকা সে নিশ্চিন্তে রওয়ানা হয়ে যাচ্ছে। আর যার ডাক এসে গেছে কিন্তু সে এখনো অপ্রস্তুত। প্রয়োজনীয় কাজ যে এখনো সম্পন্ন করেনি। সে প্রস্তুতি ছাড়াই রওয়ানা হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের জীবনের সবচে বড় সফরের প্রস্তুতি কি আমরা সম্পন্ন করেছি? প্রয়োজনীয় পাথেয় কি আমাদের সঙ্গে আছে? নাকি আমরা নিশ্চিত মৃত্যুকে ভোলার ভান করে আছি? অতি নিকটের মৃত্যুকেও মনে করছি অনেক দূরে?

আমরা জানাযার নামায পড়ি। লাশ দাফন করি। কতজনকে চিরবিদায় জানাই। এরপরও দুনিয়া নিয়ে এত ভাবি, মনে হয় যেন চিরদিন আমরা এখানে থাকবো! যেন কেবল আমরা ছাড়া বাকি সবার জন্যই মৃত্যুর বিধান!

প্রিয় পাঠক, আমরা পুরো জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি গাফলতে। অবহেলায়। উদাসীনতায়। আজ একটু সতর্ক হই। একটু ভাবি। একটু দাঁড়াই যেমন মুসাফির দাঁড়ায় স্টেশনে। একটু ভাবি, কতটুকু পথ পাড়ি দিয়েছি আর কতটুকু বাকি?

আজ আমরা একটু আমাদের হিসাবের খাতা খুলে দেখি যেমন ব্যবসায়ী তার খাতা খুলে। একটু দেখি, বিগত বছরে কী পরিমাণ লাভ হয়েছে আর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে।

আমরা আমাদের হাত দুটি একটু প্রসারিত করে বলি—হে আমাদের রব! অতীতে যা কিছু হয়েছে ক্ষমা করে দিন। ভবিষ্যতে উত্তম কাজ করার তাওফীক দিন।
হে আল্লাহ, আপনি যদি এমন আরেকটি নতুন বছর আমাদের ভাগ্যে লিখে থাকেন তাহলে আগত দিনগুলো আমাদের জন্য করুন কল্যাণময়। আমাদের পূর্ববর্তীদের জন্যও কল্যাণের ফায়সালা করুন।

আর যদি এমন লিখন না থাকে তাহলে আপন দয়া ও মেহেরবানীতে আমাদের উত্তম মৃত্যু ও কল্যাণময় সমাপ্তি নসীব করুন। আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিন। আমাদের অন্যায়সমূহ মিটিয়ে দিন এবং পূণ্যবানদের মধ্যে আমাদের শামিল করে নিজের কাছে তুলে নিন। # (সংক্ষেপিত)

মূল : শায়খ আলী তানতাবী
অনুবাদ : মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব