পার্বতীপুরের ফুটবল স্টার শমশের


শাহাজুল ইসলাম প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের উত্তর জনপদের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনের জন্য বিখ্যাত ও খনি সমৃদ্ধ এলাকা। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকে এ এলাকা ছিল ফুটবল খেলা ও বিখ্যাত খোলোয়াড়দের স্বর্গীয় উদ্যান । যেখানে একসময় দেশ বরেণ্য কিংবদন্তি যাদুকর সামাদ সুনামের সাথে ফুটবলের জাদুকরি ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন, যেখনে উত্তর বঙ্গের নাজাদা ডাকসাইটে খেলোয়াড় ছিলেন মহির উদ্দিন। স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাস ও পরবর্তী কিছু সময় হারিয়ে যায় খেলোয়াড়দের জীবন থেকে। পরবর্তী ধাপে আশির দশকের খেলোয়াড় হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ না করলেই নয় তারা হলেন, তোফয়েল আহমেদ, সোহেল, তুষার, বলেট, রুবেল, শাহাদত হোসেন (সাদো) যিনি বর্তমানে বরিশাল বিকেএসপির পরিচালক, গোল রক্ষক হান্নান ও কামু । সেই পার্বতীপুরের ফুটবল জগৎটাকে জিয়ে রেখেছেন একজন উজ্জল ফুটবল খেলোয়াড় এবং সংগঠক মোঃ শমশের আলী। যাকে পার্বতীপুরের “ফুটবল স্টার” খেতাবে ভূষিত করা যায়। যিনি উত্তরবঙ্গসহ এদেশের ফুটবল প্রেমীদের নিকট সুপরিচিত । খেলোয়াড় হিসেবে ১৮ বছর স্বর্ণালি ক্যারিয়ার পেরিয়ে গেলেও ধরে আছেন পার্বতীপুরের ফুটবলের জগৎটাকে ।

খেলোয়াড় শমশের আলীর জন্ম ১৯৮১ সালের ১২ই ডিসেম্বর পার্বতীপুর পৌরসভার রোস্তম নগর মহল্লায়। তার পিতার নাম আব্দুল্লাহ সরদার। তিনি রোস্তম নগর মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করে পার্বতীপুর আদর্শ কলেজে লেখাপড়া করেন। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার ফাঁকে ফুটবল খেলা অনুশীলন করতেন। তার ফুটবল ওস্তাদের নাম মরহুম জহুরুল হক মিনা। যিনি মিনা ভাই হিসেবে পার্বতীপুরের ফুটবল অঙ্গনে সুপরিচত ছিলেন।

১৯৯৭ সালে পার্বতীপুর ফুটবল কল্যাণ সমিতির পক্ষে প্রথম খেলায় অংশ গ্রহণ করে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত ঢাকার পাইওনিয়ার ফুটবল লীগে খেলেন। এলাকা ভিত্তিক প্রতিযোগিতায় কৃতি খেলোয়াড় হিসেবে তার জীবনের প্রথম পুরস্কার সিল্ড অর্জন করেন ১৯৯০ সালে। শমশের ২০০৩ সালে অনূর্ধ্ব ১৭ এবং অনুর্ধ ২০ জাতীয় দলের ডগ স্কোয়াডে থেকেও জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু অসাধু কিছু স্বজনপ্রীতি করা সংগঠকের কাছে ধুলিষ্যাৎ হয়ে যায় তার স্বপ্ন। ২০১০ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে ৯ দিন থাকার পর ছিটকে যেতে হয় এই খেলোয়াড়কে। তবুও তিনি ফুটবলের হাল ছাড়েন নি। তিনি তৃনমুলের কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার জন্য যা করেছেন তা বাংলাদেশের খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়েই বেঁচে থাকবে। বর্তমান খেলাধুলার ক্ষেত্রে কিশোর ও তরুণদের জন্য ব্যাক্তিগতভাবে ফুটবল ক্রয়, জার্সী, প্যান্ট, হুজ, সিঙ্গগার্ড প্রদানসহ নিজের উপার্জিত টাকা ব্যয় করে পার্বতীপুরে খেলোয়াড় গড়ার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন অবিরাম। তৃণমুলে পড়ে থাকা ফুটবল পাগল সংগঠক শমসের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে ফুটবলের ভাবনা ভেবে নিজের ঘুম হারাম করে দিনের পর দিন সবুজ মাঠের নেশায় ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে চলেছেন।

তিনি উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল, উপজেলা, জেলাসহ বাংলাদেশের ৪২ টি জেলায় ফুটবলের সাথে বিচরণ সহ ভারতে ৪৯ বার সফর করেছেন। ভারতের শিলিগুড়ি, কুচবিহার জেলার মেথলিগঞ্জ থানায় প্রথম নারায়ন গঞ্জের ফুটবলার মরহুম আজিজ আরমানের হাত ধরে আন্তর্জতিক টুর্ণামেন্টের প্রথম অভিষেক। তারপর ভারতের ছত্রিশগড় প্রদেশের রাজধানী রায়পুরে একটি আন্তর্জাতিক টুর্ণামেন্টে পার্বতীপুর ফুটবল একাডেমির অধিনায়ক ও ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া উড়িষ্যার ভাষান্ডি মাঠে আন্তর্জাতিক টুর্ণামেন্টে সেমি ফাইনালে পাঞ্জাব দলের বিপক্ষে খেলেন। ভারতের মাটিতে পার্বতীপুর ফুটবল একাডেমিকে নিয়ে ৭ টি আন্তর্জাতিক ফুটবল টূর্ণামেন্টে অংশ গ্রহণ করে বিভিন্ন জেলার খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারে বেশ উজ্জল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। এমনকি ফুটবলের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকেই তরুণ উদীয়মান খেলোয়াড়দের নিয়ে ২০১৫ সালে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন ফুটবল একাডেমী পার্বতীপুর। যে সংগঠনটি এখন “পার্বতীপুর ক্রীড়া একাডেমি” নামে নব গঠিত। কিশোর ও প্রতিভাবান তরুণদের মাঠমুখী করতে ও ভালমানের খেলোয়াড় গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবিরামভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। যেখানে সকল স্তরের ফুটবলাররা বিনা খরচে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতে পারে। ইতিমধ্যে এই একাডেমীর নামকরা কয়েকজন খেলোয়াড় সাখাওয়াত, পাভেল, সঞ্জিত, লালা, আল-আমিন, মাহামুদুলরা উত্তরবঙ্গে দাপটের সাথে ফুটবল খেলে যাচ্ছে।

শমশের বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হাসান আল মামুনের অন্ধ ভক্ত। তার খেলা দেখতে সুদূর পার্বতীপুর থেকে ঢাকা বঙ্গবন্ধু ষ্টেডিয়ামে গিয়ে ২৩টি ম্যাচ দেখেছেন।

কৃতি ফুটবলার শমশের একজন খেলোয়াড় এবং পরিচালক হিসেবে প্রতিদিন নিজে মাঠে উপস্থিত থেকে ফুটবলারদের খেলায় উৎসাহিত করে যাচ্ছেন। তার এই অদম্য ফুটবল পেশাদারিত্ব তাকে উত্তরবঙ্গে সফল সংগঠক হিসেবেও যথেষ্ট পরিচিতি এনে দিয়েছে। জনপ্রিয় ফুটবলার শমসের এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ফুটবল খেলাকে তৃণমুলের সবুজ মাঠে যারা ব্যক্তিগতভাবে এবং ফুটবল একাডেমী পাবর্তীপুরের মত সাংগঠনিকভাবে জিইয়ে রেখেছেন তাদের দিকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সহ শীর্ষ পর্যায়ের সংগঠকদের নজর দিতে হবে এমনকি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও স্থানীয় প্রশাসন দ্বারা তাদের আর্থিক প্রণোদনাসহ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেয়া হলে তৃণমুল থেকে শত শত ফুটবলার দেশের জন্যে সরবরাহ করা সম্ভব। তিনি আরো বলেন, ফুটবলই আমার ধ্যান এবং ফুটবলই আমার জ্ঞান। যতদিন বেঁচে থাকবো ফুটবল খেলার উন্নয়নের জন্য কাজ করে যেতে চাই। #