লালমনিরহাট বুড়িমারীতে মানবধিকার কমিশনের তদন্ত দল


লালমনিরহাট প্রতিনিধি : রোববার সকালে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সরেজমিন পরিদর্শনে যান জাতীয় মানবধিকার কমিশনের অভিযোগ ও তদন্ত বিভাগের পরিচালক আল মাহমুদ ফাউজুল কবিরসহ ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি।

সেসময় মসজিদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পুড়িয়ে ফেলারস্থল পরিদর্শন ও বিভিন্নজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। পরিদর্শন শেষে কমিটির প্রধান, মানবধিকার কমিশনের পরিচালক আল মাহমুদ ফাউজুল কবির বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে আপাতত নিশ্চিত যে, কোরআন অবমাননার বিষয়টি সম্পূর্ণ অসত্য। তবে নিহত জুয়েল কেন বুড়িমারীতে এসেছিলেন? কারা ঘটনার জন্য দায়ী? এবং বিষয়টি পরিকল্পিত কিনা? সে বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হবে।’

বুড়িমারী মহাসড়কটি যেন শ্মশান ঘাট!

এ সময় কমিটির প্রধান ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অভিযোগ ও তদন্ত বিভাগের পরিচালক আল মাহমুদ ফাউজুল কবির বলেন, ‘নিহত জুয়েল কেন বুড়িমারীতে এলো? তাকে যখন মারধর করা হচ্ছে তখন তার সঙ্গে থাকা অপর লোকটি তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছে কি না? আবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তি তাকে হঠাৎ করে কেন তাকে মারধর করলো? নিহত জুয়েল কোরআন অবমাননা করেছেন কি না? ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হাফিজুল নিহত জুয়েলকে অন্য স্থানে না সরিয়ে দীর্ঘক্ষণ পরিষদে আটকিয়ে কেন রাখলো? অনেক পরে কি কারণে পুলিশকে খবর দেওয়া হলো? বহিরাগত লোকজন কার ডাকে আসলো? এ ঘটনায় কারো ইন্ধোন আছে কি না?’। এছাড়াও নানা বিষয়ে তদন্ত করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, কমিশন তদন্ত করে ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিএম রাহসিন কবির, সিনিয়ন সহকারী পুলিশ সুপার তাপস সরকার উপস্থিতি ছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শহিদুন্নবী জুয়েল বৃহস্পতিবার বিকেলে সুলতান যোবাইয়ের আব্দার নামে একজন সঙ্গীসহ বুড়িমারী বেড়াতে আসেন। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা।

নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার পায়ে পড়ে যায়। এ সময় তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও সুলতান যোবাইয়েরকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখে। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হন।

সন্ধ্যায় পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দরজা জানালা ভেঙে প্রশাসনের কাছ থেকে জুয়েলকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ টেনে পাটগ্রাম বুড়িমারী মহাসড়কে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় স্থানীয়রা। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।

সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা থানা পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দফায় দফায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইট পাথরের আঘাতে পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন্ত কুমার মোহন্তসহ ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ১৭ রাউন্ড ফাঁকাগুলি ছোড়ে পুলিশ।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর ও পুলিশ সুপার (এসপি) আবিদা সুলতানা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনেন। নিহত জুয়েলের সঙ্গী সুলতান যোবাইয়েরকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ।

ঘটনাটি তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টিএমএ মমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত জুয়েলের চাচাত ভাই সাইফুল আলম, পাটগ্রাম থানার এসআই শাহজাহান আলী ও বুড়িমারী ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত বাদি হয়ে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও দেখে আসামি শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতাররা সবাই বুড়িমারী এলাকার বাসিন্দা বলে জানায় পুলিশ।#