দিনাজপুর জেলায় মরুকরণের সব লক্ষণই দেখা যাচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক : সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দেশের সবচেয়ে উঁচু জেলা দিনাজপুরে মিলছে মরুকরণের নানা লক্ষণ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৭.৫০ মিটার উচ্চতার এ জেলার নদীতে জেগেছে চর, পানির স্তর নিচে নামছে। এছাড়া মরুকরণের ইঙ্গিত বহনকারী উদ্ভিদ সূর্য শিশিরের দেখাও মিলেছে। ফলে শস্য শ্যামল দিনাজপুর জেলাটি হয়তো একদিন হারিয়ে যেতে পারে মরুভূমির ধূসর বালির গহ্বরে। দিনাজপুরের সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এমনটাই ধারণা করছেন।

বিশ্ব খরা ও মরুকরণরোধী দিবস উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে এ তথ্য জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরুকরণের প্রধান দুটি বিষয়ের একটি বিস্তৃত এলাকাজুড়ে মাটি অনুর্বর, নদী-নালা, খাল-বিল শুকানো এবং বৃষ্টি কমে যাওয়া। দ্বিতীয় মাটির অম্লতা বৃদ্ধি। বিগত কয়েক দশক ধরে এ দুটি বিষয় খুব বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে দিনাজপুরে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রধান অফিস খামারবাড়ি থেকে দিনাজপুর জেলার ওপর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের একটি প্রতিবেদন সংগ্রহ করে জাগো নিউজ।

প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, জেলার পাঁচ উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোতে ২৭টি চর জেগেছে, যা নদী-নালা, খাল-বিল শুকানোর ইঙ্গিত বহন করছে। এসব চর ২৫টি ব্লকে ভাগ করে চাষের আওতায় এনেছে জেলা কৃষি বিভাগ। যার মোট আয়তন ৯০৬ হেক্টর। এছাড়া অধিক ফসল ফলাতে জমিতে জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের উত্সাহিতকরণে ব্যাপক প্রচারণা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, নদীতে পানিপ্রবাহে যথাযথ উদ্যোগ, খাল-বিল ও জলাভূমিসমূহ সংরক্ষণে গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

জানা গেছে, চিরিরবন্দর উপজেলায় কাঁকড়া নদীতে মরানদী চর, পূর্বসাইতারা চর রয়েছে। বীরগঞ্জের ঢেপা ও পূর্ণভবা নদীতে রয়েছে নিজপাড়া, ধুলাউড়ি, ভোগডমা, বর্ষা, বিজয়পুর, ভোলানাথপুর, মিটিয়াকুড়া ও ভগিরপাড়া চর। খানসামার ইছামতি নদীতে জেগেছে গোবিন্দপুর, বাসুলি, শুশুলী, ডাঙ্গাপাড়া, বেলপুকুর, জোয়ার, কায়েমপুর, শুড়িগাও, আগ্রা ও কাচিনিয়া চর।

কাহারোলের তেঁতুলিয়া (তুলাই) নদীতে কান্তনগর, রামচন্দ্রপুর, সুন্দরপুর, ঈসানপুর, উচিৎপুর ওবলেয়া চর। ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীতে কুলানন্দপুর চরের কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাকি আট উপজেলায় কোনো চরের কথা উল্লেখ না থাকলেও বাস্তবে সেগুলোতেই অনেক চর রয়েছে। এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখিত ছাড়াও বাদ পড়েছে অনেকগুলো চরের নাম।

এছাড়াও দিনাজপুরে কাগজ কলমে ৭৫টি বিল রয়েছে। সেগুলোও ভরাট, দখল দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে।

দিনাজপুরে কমেছে বৃষ্টিপাতও। জেলা আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র সহকারী তোফাজ্জুর রহমান জানান, ২০২০ সালের জুনে দিনাজপুরে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৪০০ মিলি। চলতি এবারে ১৭ জুন হয়েছে ৯০ মি লি। জুনের বাকি কয়েক দিনে ২০০ মিলি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসেবে গত বছরের তুলনায় ১১০ মি লি বৃষ্টিপাত কম হবে।

অপরদিকে, ইটভাটার কারণে মাটিতে অম্লতা বেড়েছে বলে নিশ্চিত করেন দিনাজপুর মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মামুন আল আহসান চৌধুরী।

জানা গেছে, দিনাজপুরে মোট ২৪৮ ইটভাটা রয়েছে। যার মধ্যে ৭৬টি পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদিত। বাকিগুলোর মধ্যে ৬৩টি অবৈধ, মেয়াদোত্তীর্ণ ২৭টি ইটভাটা এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে ৮০টি।

কৃষিবিদ মো. মামুন আল আহসান চৌধুরী জানান, মাটির পুষ্টিগুণ উর্বরতা ঠিক রাখতে যে ১৬টি খাদ্য উপাদান প্রয়োজন তার ৯টির ঘাটতি রয়েছে দিনাজপুরের মাটিতে। ফলে মাটিতে অম্লতা বেড়েছে। মাটিতে অম্ল বেড়ে যাওয়া মরুকরণের লক্ষণ। সেদিক থেকে দিনাজপুর মরকরণের দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে।

অপরদিকে ২০১৯ সালের পর থেকে প্রতি বছর দিনাজপুর সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে সংরক্ষিত পুকুরপাড়ের পশ্চিম তীরে বিলুপ্তপ্রায় পতঙ্গভুক ‘সূর্যশিশির’ উদ্ভিদ দেখা যায়, যা মরুকরণ হওয়ার লক্ষণ।

দিনাজপুরের শিক্ষক, গবেষক ও উদ্ভিদবিদ বিশেষজ্ঞ মো. মোসাদ্দেক হোসেন জানান, দিনাজপুরের মৃত্তিকায় মরুজ উদ্ভিদসমূহের জন্ম এবং বিকাশ মরুকরণের প্রভাব আঁচ করা যাচ্ছে। একদিকে সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ যথেষ্ট না থাকা এবং ভূগর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহার মরুকরণতার প্রভাবকে ত্বরান্বিত করছে। ক্রোটন, দুধিয়া, দুধস্বর, সূর্যশিশিরসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ তারই সাক্ষর বহন করছে। দিনাজপুরের মাঠে ঘাটে ক্রোটন উদ্ভিদের অধিক জন্মানোর হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট করছে। #