কে এই হেলেনা জাহাঙ্গীর : বাসায় মিলল ইয়াবা মদ হরিণের চামড়া


অনলাইন ডেস্ক : আওয়ামী লীগের উপকমিটির সদস্য পদ হারানো এফবিসিসিআইর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরের রাজধানীর গুলশানের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল মাদক উদ্ধার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে ১৭ বোতল বিদেশি মদ, বিপুল ইয়াবা। এছাড়া হরিণের চামড়া ও ওয়াকিটকিও উদ্ধার করা রয়েছে। এসময় তার ব্যবহৃত দুটি অস্ত্র পাওয়া গেছে। তবে সেগুলোর বৈধ কাগজ রয়েছে।

অভিযানে থাকা র‍্যাবের একাধিক কর্মকর্তা ঢাকাটাইমসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে র‍্যাবের কোনো কর্মকর্তা কথা বলেননি।

এদিকে অবৈধ মাদক উদ্ধারের ঘটনায় হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আটক করেছে র‍্যাব। কিছু সময়ের মধ্যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হবে বাহিনীটির সদরদপ্তরে। এলিট ফোর্সটি বলছে, মাদক উদ্ধারের ঘটনায় তাকে আটক দেখানো হবে।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের রাজধানীর গুলশানের বাসায় বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান শুরু করে র‍্যাব। রাত সাড়ে আটটা থেকে শুরু হওয়া অভিযানে বিপুল সংখ্যক র‍্যাব সদস্য বাড়ির ভেতর ও বাইরে অবস্থান নিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেখে আলোচিত এই নারী অঝরে কাঁদতে থাকেন। এসময় তাকে শান্ত করা হয়।

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, তিনটি ফ্লোর মিলে তিনি এই ভবনটিতে বসবাস করতেন। যেখানে ১৭টি রুম রয়েছে। এসব রুমেই মিলেছে অবৈধ মাদকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। তাকে মাদকের বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করতে আটক করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানের ৫ নম্বর সড়কের ৩৬ নম্বর বাসায় অভিযান শুরু করে র‍্যাব। এই নিউজ লেখা পর্যন্ত তার বাসায় অভিযান চলছিল। বাসাটি ঘিরে র‍্যাবের বিপুল সংখ্যক সদস্য অবস্থান নিয়েছেন। এছাড়া বাড়িটির ভিতরে প্রবেশ করে তল্লাশী করছে র‍্যাব সদস্যরা। এর আগে রাত সাড়ে নয়টার দিকে এলিট ফোর্স র‍্যাবের নারী সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করেন।

সম্প্রতি ফেসবুকে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নাম আসায় তাকে উপকমিটির পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি।

কে এই হেলেনা জাহাঙ্গীর :-

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরগরম হেলেনা জাহাঙ্গীর ইস্যু। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে আলোচিত এই ব্যবসায়ীর আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য পদ বাতিল করা হয়েছে। এবার তার গুলশানের বাসায় অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাবের একাধিক টিম।

ফেসবুকে বেশ সক্রিয় হেলেনা জাহাঙ্গীর মূলত একজন নারী উদ্যোক্তা হলেও কিছুদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন পাননি। সম্প্রতি কুমিল্লা-৫ আসনের উপনির্বাচনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন কিন্তু মনোনয়ন পাননি।

কুমিল্লার মেয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরে ব্যবসায়ী হিসেবে উত্থান খুব বেশিদিন আগের নয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায় তার। হেলেনার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাঙ্গীর। বিয়ের পর শেষ করেন স্নাতকোত্তর। এরপর উদ্যোক্তা হিসেবে পথ চলা শুরু।

ব্যবসায়ীর বাইরে তিনি একাধিক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত আছেন বলে জানা গেছে। হেলেনা জাহাঙ্গীর গুলশান ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গলফ ক্লাব, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলশান জগার্স সোসাইটি ও গুলশান হেলথ ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

জানা গেছে, হেলেনা জাহঙ্গীর প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১০ হাজারেও বেশি কর্মী আছে তার এসব প্রতিষ্ঠানে।

হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য ও নির্বাচিত পরিচালক। এ ছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএরও সক্রিয় সদস্য তিনি। ‘জয়যাত্রা’ নামে একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনেরও মালিক তিনি।

যেভাবে হেলেনার উত্থান

হেলেনা জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে। উইকি ফ্যাক্টসাইডার নামের একটি ওয়েবসাইটে তার পেশা হিসেবে অ্যাংকর বা উপস্থাপক উল্লেখ করা হয়েছে। হেলেনার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম একজন ব্যবসায়ী। ১৯৯০ সালে তারা বিয়ে করেন। তিনি তিন সন্তানের জননী।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সেই সূত্রে জন্ম কুমিল্লায় হলেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী, সদরঘাট এলাকায়। পড়াশোনা স্থানীয় কৃষ্ণচূড়া স্কুলে।

এফবিসিসিআই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একাধিক গণমাধ্যমকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের দেয়া সাক্ষাৎকার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের সময় স্বামী জাহাঙ্গীর আলম নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠিত পোশাক কারখানার জিএম পদে চাকরি করতেন। পাশাপাশি সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসার সঙ্গেও সংশ্লিষ্টতা ছিল।

তবে গৃহিণী হিসেবে বসে না থেকে পড়াশোনা শেষ করে হেলেনা জাহাঙ্গীর শুরুতে চাকরির চেষ্টা করেন। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য ইন্টারভিউও দিয়েছেন তিনি। একদিন চাকরি খোঁজার সূত্র ধরে চলে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের অফিসে। সেখানে স্বামীর অফিস কক্ষ দেখে তিনি ঠিক করেন নিজেই উদ্যোক্তা হওয়ার। স্ত্রীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলম।

বিয়ের ছয় বছর পর ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মিরপুর ১১ তে একটি ভবনের দুটি ফ্লোর নিয়ে তিনি শুরু করেন প্রিন্টিং ও অ্যামব্রয়ডারি ব্যবসা।

সম্প্রতি চাকরিজীবী লীগ নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নেতা বানানোর আহ্বান জানানোর একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বিতর্ক জন্ম দেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। কথিত এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীর ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাহবুব মনিরের নাম উল্লেখ করা হয়।পরে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটি থেকে তার সদস্য পদ বাতিল করা হয়।

গত রবিবার হেলেনা জাহাঙ্গীরকে অব্যাহতি দিয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উপকমিটির সদস্যসচিব ও আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ সই করেন। এতে বলা হয়, হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সংগঠনের নীতিবহির্ভূত হওয়ায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্যপদ হতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। #