কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় ১৩ মাস ধরে পড়ে আছে ৩০০ কোটি টাকার ইঞ্জিন


অনলাইন ডেস্ক : গত বছর আগস্ট মাসে দেশে এসেছে ১০টি নতুন মিটার গেজ ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ)। এগুলো কেনা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কম্পানি হুন্দাই রোটেমের কাছ থেকে। কিন্তু ইঞ্জিনগুলো এখনো বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হয়নি। পড়ে আছে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায়। মূলত চুক্তির শর্ত মেনে ইঞ্জিনগুলো তৈরি হয়নি এবং এগুলোতে ত্রুটি রয়েছে এমন কারণ দেখিয়ে তখন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান প্রকল্প পরিচালক (পিডি)। এরপর থেকেই জটিলতা শুরু।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০১৮ সালের ১৭ মে ১০টি নতুন মিটার গেজ ইঞ্জিন কেনার জন্য হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এগুলোর দাম প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী এরই মধ্যে ২৫

শতাংশ টাকা পরিশোধও করা হয়েছে। আর ৬৫ শতাংশ টাকা ইঞ্জিনগুলো বুঝে পাওয়ার পর এবং কার্যকারিতা পরীক্ষার পর বাকি ১০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক নূর আহাম্মদ হোসেনের আপত্তির কারণে হুন্দাই রোটেমকে পরবর্তী বিল দেওয়ার প্রক্রিয়া আটকে যায়।

প্রকল্প পরিচালকের আপত্তির পর গত বছরের ডিসেম্বরে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। সেই কমিটি চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, ইঞ্জিনগুলো তৈরির ক্ষেত্রে যেসব শর্ত ছিল তা মানা হয়নি। ইঞ্জিন, অলটারনেটর, কম্প্রেসার ও ট্রাকশন মোটর—এই চারটি মূল যন্ত্র চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়নি। ইঞ্জিনের ব্রেক হর্সপাওয়ার ২২০০বিপিএইচ ও ট্রাকশন হর্সপাওয়ার ২০০০টিএইচপি হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষামূলক চালানোর সময় পাওয়া গেছে যথাক্রমে ২১৭০বিপিএইচ ও ১৯৪২টিএইচপি। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি হুন্দাই রোটেম ও প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শক প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের সিসিআইসিকে অভিযুক্ত করে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করে। তবে এখনো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরবর্তী সময়ে আবার ইঞ্জিনগুলো নিম্নমানের কি না তা যাচাই করতে চলতি বছরের ২৩ মার্চ কারিগরি একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিও ইঞ্জিনগুলো গ্রহণে আপত্তি জানায়। তবে কমিটির পক্ষ থেকে ইঞ্জিনগুলো যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে বলা হয়। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা বলতে রাজি হননি। স্বাধীন পর্যবেক্ষক ইঞ্জিনগুলো গ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছে।

এরই মধ্যে বদলি হয়েছেন ওই প্রকল্পের পরিচালক। বর্তমান প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে আছেন হাসান মনসুর। তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করা হবে কি না তা মন্ত্রণালয় ঠিক করবে, এটা আমার কাজ না। তবে আমি বলতে পারি, এগুলো পৃথিবীর সেরামানের ইঞ্জিন, এতে কোনো ত্রুটি নেই। আগের পিডি কেন এগুলো আটকে রেখেছিলেন তা আমার মাথায় আসে না।’ তিনি বলেছেন, ইঞ্জিনগুলোতে শুধু অলটারনেটর ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা নেই। টিএ-৯ মডেলের অলটারনেটর দুই হাজার হর্সপাওয়ারের জন্য উপযুক্ত।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় আরো ১০টি মিটার গেজ ইঞ্জিন একই কম্পানির কাছ থেকে আনা হয়েছিল। সেগুলো কিন্তু ঠিকই চলছে। এই ইঞ্জিনগুলোকে আটকে রাখার কোনো কারণ নেই। এগুলো পরীক্ষামূলক চলাচলের সময় কোনো সমস্যাই হয়নি।

জানা গেছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ইঞ্জিনগুলো কেনা হয়েছে। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইঞ্জিনগুলোর মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যদি এই সময়ের মধ্যে টাকা দেওয়া না হয় তাহলে এডিবি ঋণ বাতিল করবে। তাই পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করছে হুন্দাই রোটেম। রেলপথ মন্ত্রণালয়ও টাকা পরিশোধের উপায় খুঁজছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ শতাংশ টাকা কেটে হুন্দাই রোটেমকে বাকি টাকা পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ইঞ্জিনগুলো বুঝে নেওয়ারও প্রক্রিয়া চলছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।#
সূত্র :কালের কণ্ঠ / quicknewsbd