জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ


অনলাইন ডেস্ক : জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্ববাজারে এলএনজি, কয়লা ও তেলের দাম ওঠানামার এ প্রবণতা নতুন কিছু নয়। আগামী দিনেও সেটা অব্যাহত থাকবে। করোনা-পরবর্তী অথনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জ্বালানির দাম অনেক বেড়েছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের জন‌্য বড় চ্যালেঞ্জ।

শনিবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ‘গ্যাস সর্টেজ, এলএনজি প্রাইস ভোলাটিলিটি: বাংলাদেশ অ্যান্ড গ্লোবাল পার্সপেক্টিভ’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সংলাপে এসব অভিমত ব‌্যক্ত করেন তারা।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম প্রেসিডেন্সির স্পেশাল এনভয় আবুল কালাম আজাদ। গেস্ট অব অনার হিসেবে ছিলেন বুয়েটের সাবেক অধ‌্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অ্যানার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার আবদুস সালেক। প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন সামিট গ্রুপের উপদেষ্টা ও পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. কামরুজ্জামান এবং বিজিএমই’র পরিচালক ও মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাভিদুল হক। অ্যানার্জি অ্যান্ড পাওয়ার (ইপি) আয়োজিত এ সংলাপ সঞ্চালনা করেন ইপি’র এডিটর মোল্লাহ আমজাদ হোসেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘নিজস্ব জ্বালানিসম্পদ আহরণে পিছিয়ে থাকা ও অনেক আগেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ায় বাংলাদেশকে সাবধানে জ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ করে এলএনজি কেনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। স্পট বাজারের ওপর বেশি নির্ভরতা এবারের মতো সংকট সৃষ্টি করতে পারে।’

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এক কার্গো এলএনজি প্রতি এমএমবিটিউ ২৯ ডলারের বেশি দামে কিনেছে। অক্টোবর মাসের জন্য দুই কার্গো এলএনজি ৩৬ ডলার দামে কিনতে যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সহনীয় দামে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।’

আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘একসময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯০ ভাগ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি মিশ্রণ মোটামুটি যথাযথ করা সম্ভব হয়েছে। তবে, অ্যানার্জি এফিশিয়েন্সি নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে এখনও কিছুই করা যায়নি। আমাদের বাতাসের যে গতি আছে, তাতে উপকূলে ৩০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সাগরের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোথাও কোথাও হচ্ছে। বিষয়টি দেখা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ আমদানি নিয়ে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। ভারত, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আরও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে জল এবং সোলার বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারলে তা কার্বনমুক্ত বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।’

অধ‌্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আসলে আমরা স্পট মার্কেট বুঝি কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। তেল আর গ্যাসের বাজার এক নয়। ওপেক তেল মার্কেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। কিন্তু এলএনজির ক্ষেত্রে তেমন কিছু নেই। গ্যাসের স্পট মার্কেট নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তিও আছে। বর্তমানে ইউরোপে ব্যাপক শীত পড়েছে। এমন সময়ে আমাদের স্পট মার্কেটই ভরসা। তবে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি না করে স্পট মার্কেটে জ্বালানি কেনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া, জ্বালানির মূল্য গড় হিসাবে চিন্তা করতে হবে। এখন দাম বেশি কিন্তু এক সময় অনেক কম ছিল। তাই গড় হিসাবে ধরলে এলএনজি বা জ্বালানির মূল্য আসলে একই থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হুটহাট করে পরিকল্পনা বদল করা ঠিক নয়। আমরা হঠাৎ করেই ১০টি কয়লা প্রকল্প বন্ধ করে এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলাম। নিজস্ব কয়লা তোলা বন্ধ রাখলাম পরিবেশের কথা বলে। কয়লা ও পরামাণু দিয়ে বেইজ লোড বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে, এলএনজি নয়। এটা হতে পারে পিকিং পাওয়ার জ্বালানি।’

ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার আবদুস সালেক সুফী বলেন, ‘জ্বালানির বাজারে আগুন লেগেছে। এদিকে, শীতও চলে এসেছে। ওয়েস্টার্ন ইউরোপে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এশিয়াতেও গ্যাস সমস্যা গুরুতর। চীনে কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে লোডশেডিং হচ্ছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিউ ৩৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।’

‘বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। যাতে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ সেখান থেকে পাওয়া যায়। ২০ শতাংশের জন্য স্পট বাজারের ওপর নির্ভর করা যেতে পারে। সঠিক দামে এলএনজি কেনার জন্য প্রাইস গেজিং অনুসরণ করে বড় জ্বালানি আমদানিকারদের সঙ্গে কোয়ালিশন করে আমদানি করা যেতে পারে।’

খন্দকার আবদুস সালেক বলেন, ‘বিশ্ব বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৮০ ডলার চলছে। তা ১০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় এলএনজি উৎপাদন দুর্ঘটনার কারণে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশের সমস্যা হলো—গ্যাস থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়। এর পরিমাণ প্রায় ৫১ ভাগ। ফার্নেস অয়েল, ডিজেলও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে। এমনিতেই আমাদের গ্যাস উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সামনের দুই বছরে আরও কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মাতারবাড়ি এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে কাজ হচ্ছে। এছাড়া, পায়রা গভীর সাগরে এফএসআরইউ করার জন্য দুটি প্রস্তাব সরকারের বিবেচনায় আছে। আমার মনে হয়, তা হবে খুব ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ভারত থেকে এলএনজি পাইপ লাইনে আমদানি নিয়ে দুটি এমওইউ হয়েছে। নিজস্ব গ্যাসফিল্ড থেকে এক বা দেড় বছরের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ঘণফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।’

ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামান বলেন, ‘এলএনজির দাম ওঠানামা অস্বাভাবিক কিছু না। কীভাবে এ দর ওঠানামা মোকাবিলা করব, সেটাই বিবেচ্য।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংকট কাটাতে ৩-৪ বছর লাগবে। সাময়িক সমাধান হিসেবে গ্যাসফিল্ডগুলোর উৎপাদন বাড়াতে হবে। কারণ, শিল্প অবশ্যই চালু রাখতে হবে। এলএনজির দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এটা ধরে নিয়েই পুরো ম্যানেজমেন্ট করা দরকার।’

নাভিদুল হক বলেন, ‘এলএনজি আমদানির পর দেশে গ্যাসের যে গড় দাম হবে, তার পুরোটাই পরিশোধ করতে হলে বস্ত্র খাত কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষম থাকবে না। তাই এ খাতের স্বার্থে সাবসিডি দেওয়া আরও কিছু সময় পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে।’

মুর্তজা আহমেদ ফারুক বলেন, ‘সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দুটি ব্লকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জেভি করা হলে অনুসন্ধান কাজে গতি আসবে। আমার পরামর্শ হচ্ছে, একক নীতি থেকে সরে এসে স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে আইওসিদের কাজে লাগাতে হবে।’ #