কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির অচলাবস্থা : রাজনীতি রক্ষায় নতুন আহবায়ক কমিটি দরকার


অনলাইন ডেস্ক : কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপিতে দীর্ঘদিন যাবৎ অচলাবস্থা চলছে। দুটি সক্রিয় গ্রুপ বিভক্ত কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি। এর বাইরে আরও একটি গ্রুপ বিরাজ করছে, যাদের স্লোগান ”কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি রক্ষা কর। দীর্ঘদিন যাবৎ বিবাদমান দুটি গ্ৰুপের কার্যক্রম দুই জেলা কার্যালয় থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির এই গ্রুপিং এর প্রভাব সকল অঙ্গদল সহ জেলার সকল উপজেলা ও পৌর ইউনিট গুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ৪ঠা নভেম্বরে। বর্তমান জেলা বিএনপির কমিটি অনুমোদন লাভ করে ২০১৬ সালের ২২শে এপ্রিল। দীর্ঘ ৬ বছরের প্রায় বিগত ৫ বছরই গ্রুপিং ,কোন্দল, বিভাজনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এখানকার বিএনপির কার্যক্রম। ২০১৫ সালের ৪ঠা নভেম্বরে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও এই সম্মেলন ও কাউন্সিলকে পাতানো ও ষড়যন্ত্রের সম্মেলন হিসাবে অভিহিত করে থাকেন অনেকেই। সম্মেলন চলাকালীন সময়ে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির প্রাণপুরুষ, বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব এডঃ রুহুল কবির রিজভী ছিলেন কারাগারে। অভিযোগ আছে যে রিজভীর কারান্তকালীন কালে তাঁকে পাশ কাটিয়ে তাঁর নিজ জেলাতে এই সম্মেলন করা হয়। জেলার অনেক নেতৃবৃন্দ এই সাজানো কাউন্সিল ও সম্মেলন বর্জন করেন ।

কমিটি অনুমোদনের বছর খানেকের মধ্যে জেলা বিএনপির সভাপতি তাসভির উল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানার মধ্যে দ্বন্দ শুরু হয়। প্রকাশ্যে রূপলাভ করে তাদের গ্রুপিং রাজনীতি। জেলা বিএনপির সভাপতি তাসভির উল ইসলাম বরাবরই ঢাকায় অবস্থান করেন। জেলা সম্পাদক সাইফুর রহমান রানার বোনজামাই যুগ্ম-সম্পাদক সোহেল হাসনাইন কায়কোবাদের পারিবারিক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে জেলা সভাপতি তাসভির এই গ্রুপিং রাজনীতিকে আরও চাঙ্গা করেন। ফলশ্রুতিতে এই দ্বন্দ কখনো কখনো সংঘর্ষে রূপ লাভ করে।

২০২০ সালের বন্যায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব এডঃ রুহুল কবির রিজভী ত্রাণ দিতে তাঁর নিজ জেলায় আসলে তাঁর সম্মুখেই বিবাদমান দুই গ্রুপ মারাত্বক সংঘর্ষ শুরু করে। এতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা, যুগ্ম-সম্পাদক সোহেল হাসনাইন কায়কোবাদ, ব্যারিস্টার রবিউল ইসলাম সৈকত সহ অনেক নেতাকর্মী মারাত্বক ভাবে আহত হন। এর প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় বিএনপি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা, যুগ্ম-সম্পাদক সোহেল হাসনাইন কায়কোবাদকে এক মাসের জন্যে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির দ্বন্দ ইতোমধ্যে প্রকট আকার ধারণ করলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সৃষ্ট সমস্যা তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করা হয় ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারীতে। ২০২১ সালের ১২ই মার্চে বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তাঁর ঢাকাস্থ নিজ কার্যালয়ে দুই গ্ৰুপের ৭ জন করে ১৪ জন নেতাকে নিয়ে তদন্ত সম্পন্ন করেন। এই তদন্ত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু ও দুই সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মেয়র জাহাঙ্গীর ও আব্দুল খালেক।

কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সৃষ্ট গ্রুপ, দ্বন্দ, বিভাজন , দুটি জেলা কার্যালয় ও ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ থেকে কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে বর্তমানে কুড়িগ্রামে বিএনপির মধ্যে অচলবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক ভাবে দলীয় কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে প্রকারন্তরে দুটি গ্ৰুপ মারমূখী অবস্থানে উপনীত হয়েছে।

এরমধ্যে বিএনপির কেন্দ্র থেকে দেশের বেশ কয়েকটি জেলার নতুন আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি ঘোষিত হয়নি। কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যে তদন্ত সম্পন্ন করেছিলেন তার রিপোর্ট এখনও তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সংশ্লিষ্ঠ নেতৃবৃন্দের নিকট উপস্থাপন করেননি। এ বিষয়ে তাঁর মতামত গ্রহণের জন্যে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে তিন দিন পূর্বে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম- মহাচিব ও দপ্তরের দায়িত্বে এডঃ রুহুল কবির রিজভী নিশ্চিত করেছেন যে এখনও রিপোর্ট জমা দেয়া হয়নি।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সভাপতি তাসভির উল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা, যুগ্ম-সম্পাদক সোহেল হাসনাইন কায়কোবাদকে এই গ্ৰুপিং ও দ্বন্দ্বের জন্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের তদন্তে প্রাথমিক ভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নূর ইসলাম নুরু অনেক আগেই দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক কুড়িগ্রাম পৌরসভা নির্বাচনে দলের বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কারণে দল থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন এবং পরবর্তীতে শুধুমাত্র প্রাথমিক সদস্য পদ নিয়ে দলে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এছাড়াও গ্রুপিং রাজনীতির কারণে অনেক শীর্ষনেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। ফলতঃ কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি এখন অচল।

এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠার একমাত্র উপায় নতুন আহবায়ক কমিটি গঠন। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী কেন্দ্রীয় বিএনপির ঢিলেমি আর ধীর্ঘসূত্রিতাকে দায়ী করছেন। অনেকে মনে করেন কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সন্তান হিসাবে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব এডঃ রুহুল কবির রিজভী ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক ইচ্ছা করলেই এতদিনে নতুন কমিটি উপহার দিতে পারতেন। তবে তৃণমূলের অধিকাংশ নেতাকর্মী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নিরবতায় ক্ষুব্ধতা ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন।