কুড়িগ্রাম থেকে মোস্তাফিজুর রহমান : ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর-অপরপক্ষ ভারতের কুচবিহারের দিনহাটা মহুকুমার সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকায় ০৭ জানুয়ারি ২০১১ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ'র সদস্যরা ফেলানী ফেলানীকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখে। ফেলানী খাতুন (জন্ম:১৯৯৬ সাল) নামের এক টগবগে তরুণ কিশোরীকে গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিএসএফ ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের জওয়ানদের এই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। ফেলানীর লাশ পাঁচ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। বিএসএফ নিজস্ব আদালতে এ ঘটনার জন্য দায়ী সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। বাবার সঙ্গে ফেলানী নয়াদিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করত। বিয়ের সাজে সজ্জিত হয়ে বিয়ের উদ্দেশে সে দেশে ফিরছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিয়ের স্বপ্ন চুরমার করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখে ফেলানীর মৃতদেহ।
সীমান্ত অনুপ্রবেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে একটা বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ নানা কারণে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার করে। এছাড়া চোরাচালান ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ক্রমশঃ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চোরাকারবার ও সীমান্ত পারাপার রুখতে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের ওপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর গুলি করার ফলে সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বাড়ছেই।
ফেলানীর বাবা নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা ইউনিয়নের বানার ভিটা গ্রামের নুরুল ইসলাম নূরু/নজরুল ইসলাম নূর ১০ বছর ধরে নতুন দিল্লিতে কাজ করতেন। তার সঙ্গে সেখানেই থাকতো ফেলানী। দেশে বিয়ে ঠিক হওয়ায় বিয়ের সাজে সজ্জিত হয়ে বাবার সঙ্গে ফেরার পথে, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া মই বেয়ে পার হওয়ার সময় কাঁটাতারের বেড়ায় কাপড় আটকে যায় ফেলানীর। এতে ভয়ে সে চিৎকার দিলে বিএসএফ সদস্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং লাশ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখে। কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়।
বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ভারত সরকারের একটি সীমান্ত প্রহরী সংস্থা। ১৯৬৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা ভারতের আধাসামরিক বাহিনীর একটি অংশ এবং এর প্রাথমিক দায়িত্ব হল ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাহারা দেওয়া ও আন্তর্দেশীয় অপরাধ প্রতিহত করা।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা ও সীমানা:
ফেলানীসহ হাজার হাজার নিরীহ নিরস্ত্র বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ। বহুবার ভারত সীমান্ত হত্যা শুন্যের কোটায় আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কখনোই রক্ষা করেনি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার (২,৫৪৬ মাইল) দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানায় বাংলাদেশ ও ভারতে।
হতভাগিনী ফেলানী হত্যার ১২ বছর পর ছোট ভাই মোঃ আরফান হোসেন (২১) বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)তে চাকরি পেয়েছে।
২০১১ সালের ০৭ জানুয়ারী ভোরে ভারতের কুচবিহার সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত কিশোরী ফেলানী খাতুনের ছোট ভাই মোঃ আরফান হোসেন এবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)'র চাকরি পেলেন।
রোববার ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ তারিখে আরফান লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন ১৫ বিজিবি'র আয়োজিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ১৮ সেপ্টেম্বর-২০২৫ তারিখে ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম পিএসসি মোঃ আরফান হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র প্রদান করেন।
লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন ১৫ বিজিবি'র কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম পিএসসি বলেন, বিজিবি সর্বদা ফেলানীর পরিবারের পাশে রয়েছে। ফেলানীর ছোট ভাই অত্র ব্যাটালিয়নে অনুষ্ঠিত বিজিবি নিয়োগ পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন।
তিনি আরও বলেছেন সীমান্তে ফেলানী হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে সে বিষয়ে বিজিবি সর্বদা সীমান্তে অত্যন্ত সতর্ক ও সচেষ্ট রয়েছে।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারী ভারতের কুচবিহার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানী খাতুন। সীমান্ত হত্যার সেই মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ফেলানীর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ন্যায় বিচারের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ফেলানীর ছোট ভাইয়ের এই নিয়োগ যেন দীর্ঘদিনের এক চাপা বেদনার মাঝে আশার দীপ্তি এনে দিয়েছে। পরিবার ও স্থানীয়দের বিশ্বাস, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে যাওয়া বোনের অসমাপ্ত স্বপ্ন একদিন সে পূর্ণ করবে।
ফেলানীর ভাই মোঃ আরফান হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল দেশের জন্য কাজ করবো। ফেলানী হত্যার পর মানুষ যে প্রতিবাদ জানিয়েছিল, তখন থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল বিজিবিতে যোগ দেওয়ার। সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। বিজিবিকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে দেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য।
ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, ভারত থেকে ফেরার পথে আমার নাবালিকা মেয়েকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখে বিএসএফ। সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারিনি। তবে দেশবাসী আর বিজিবি সব সময় আমাদের পাশে ছিল। দোকান করে দিয়ে সহায়তা করেছে। আজ আমার ছেলে মেধা ও যোগ্যতায় বিজিবিতে সুযোগ পেলো। এটা আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি।
নিরীহ নিরস্ত্র বাংলাদেশীদেরকে হত্যার দায় এড়াতে পারেনা ভারত :
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের দরিদ্র নূরুল ইসলাম পেটের তাগিদে আর ১০ জনের মতো পাড়ি জমান ভারতে। পরিবার নিয়ে থাকতেন দেশটির বঙ্গাইগাঁও এলাকায়। নূরুল ইসলামের বড় মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। বিয়ের উদ্দেশে কাঁটাতার টপকে নিজ দেশে আসতে হবে তাদের। ৭ জানুয়ারি ভোর ছয়টা। ফুলবাড়ির অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে কাঁটাতার টপকায় ফেলানীর বাবা। পরে কাঁটাতার টপকানোর চেষ্টা করে ফেলানী। এ সময় বিএসএফের গুলিতে বিদ্ধ হয় এই কিশোরী।
গুলিবিদ্ধ হয়ে আধাঘণ্টা ধরে ছটফট করে কাঁটাতারেই ঝুলন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে মৃত্যু হয় ফেলানীর। নিথর দেহ কাঁটাতারেই ঝুলে থাকে দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘণ্টা। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। এরপর বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন।
সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দেয়। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বর্বরতা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফেলানী হয়ে উঠে প্রতিবাদের প্রতীক। বিশ্ব মিডিয়ায় ফেলানী খাতুনের মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার ঝুলন্ত ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ায় ভারত হত্যাকারী বিএসএফ সদস্যদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্রহসনের বিচার করা হয়।
ফেলানী হত্যার পর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংগঠন বিএসএফকে একটি "খুনি বাহিনী" হিসেবে অভিহিত করে। বিশ্বজুড়ে প্রচার হয় প্রতিষ্ঠিত বিএসএফ একটি বর্বর বাহিনী। এই বাহিনী এর আগেও বহু নারী ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে একের পর এক সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও টুঁ শব্দটি করেনি শেখ হাসিনা সরকার। গত ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত হত্যা নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের কড়া সমালোচনা করলেও হত্যা বন্ধ হয়নি। ৫ আগস্টের পরও বিএসএফের হাতে সীমান্তে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়েছে।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: রুকুনুজ্জামান, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: ০১৫৫৬৩০৫০২৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত