আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :
মৃত্যুর সাত বছর পর এক নারী অলৌকিকভাবে ফিরে এলেন সরকারি দফতরে, দিলেন নিজের জমির ‘না-দাবি’ জবানবন্দি! সিনেমার গল্প মনে হলেও, এমনই এক চাঞ্চল্যকর ও অমানবিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে। মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ১ একর ৫৮ শতক জমি হাতিয়ে নেওয়ার এই ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও সেটেলমেন্ট অফিসের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাসূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার এসকে বাজার মহল্লার মৃত কোরবান আলীর স্ত্রী খায়রুন বেগম ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তার রেখে যাওয়া ১ একর ৫৮ শতক জমি (আরএস খতিয়ান-২৭৯) ওয়ারিশ সূত্রে তার সন্তানরা ভোগদখল করে আসছিলেন এবং জরীপ শেষে অনলাইন খতিয়ানও হাতে পান।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন একই এলাকার মৃত শফিউল আলমের দুই পুত্র শহিদ আলম ও ফরিদ আলম মৃত খায়রুন বেগমকে ‘প্রতিপক্ষ’ দেখিয়ে ওই জমির মালিকানা দাবি করে জোনাল সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে আবেদন করেন। অভিযোগ রয়েছে, গত ৩ ডিসেম্বর শুনানির দিন মৃত খায়রুন বেগমের নামেই নোটিশ ইস্যু করা হয়, যা তার সন্তানদের জানানো হয়নি। ওইদিন এক অজ্ঞাত নারীকে ‘খায়রুন বেগম’ সাজিয়ে জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার সামনে ভুয়া জবানবন্দি দেওয়ানো হয় এবং জমিটি বাদীদের নামে দেওয়ার আদেশ জারি করা হয়।
মৃত মায়ের জমি জালিয়াতির মাধ্যমে হাতছাড়া হওয়ার খবর পেয়ে তার পুত্র মোতাহার হোসেন ও আতোয়ার হোসেন জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার শরণাপন্ন হন। গত ১৫ ডিসেম্বর পুনরায় শুনানির দিন ধার্য হলে সেখানে প্রমাণিত হয় যে, খায়রুন বেগম অনেক আগেই মারা গেছেন এবং ৩ ডিসেম্বরের জবানবন্দিটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। সেদিন কর্মকর্তা শাহীনুর ইসলাম সবার সামনে পূর্বের ভুল আদেশ বাতিল করে মৃত মহিলার সন্তানদের নামে খতিয়ান বহাল রাখার ঘোষণা দেন।
তবে নাটকের শেষ এখানেই নয়। গত ১৫ জানুয়ারি আবারও রহস্যজনকভাবে শুনানির দিন ধার্য করা হয়। সেদিন বাদীরা পেশিশক্তি প্রয়োগ করে আগের জালিয়াতির আদেশ বহাল রাখতে চাপ সৃষ্টি করলে জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মোঃ শাহীনুর ইসলাম এক অবিশ্বাস্য মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ৩ ডিসেম্বরের আদেশ ভুল হোক বা শুদ্ধ, সেটিই বহাল থাকবে। আমি নতুন করে কোনো শুনানি গ্রহণ করব না।
সাত বছর আগে মারা যাওয়া মাকে সরকারি নথিতে ‘জীবিত’ সাজিয়ে জমি ছিনিয়ে নেওয়ার এই ঘৃণ্য প্রচেষ্টায় ভেঙে পড়েছেন খায়রুন বেগমের সন্তানেরা। তাদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে আদেশ সৃষ্টি করা আইনত অসম্ভব এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
গতকাল বিকেলে দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ আরও অনেক সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, এই কার্যালয়টি এখন অনিয়ম আর জালিয়াতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রকৃত মালিকরা তাদের অধিকার হারাচ্ছেন।
উপস্থিত সাধারণ জনগণ বলেন, একটি স্বাধীন দেশে মৃত মানুষকে ব্যবহার করে এমন জালিয়াতি শুধু আইনি অপরাধ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মোঃ শাহীনুর ইসলাম ও কর্মচারী মোঃ আবুল কালামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দিনাজপুরের সাধারণ মানুষ। তারা প্রশ্ন তুলেন সরকারের উচ্চমহল কি পারবে এই অসহায় সন্তানদের তাদের পৈতৃক জমি ফিরিয়ে দিয়ে বিচার নিশ্চিত করতে?
প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: রুকুনুজ্জামান, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: ০১৫৫৬৩০৫০২৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত