পার্বতীপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনকে কেন্দ্র করে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি এবং দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দলের কর্মসূচি পালন, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে উভয় পক্ষ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১টা ১০ মিনিটে পার্বতীপুর প্রেসক্লাবে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতারা আগামী ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় কর্মসূচি পালনের বিষয়ে বক্তব্য দেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়করা বলেন, দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ.জেড.এম. রেজওয়ানুল হক বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও দলের নাম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।
তাদের দাবি, রেজওয়ানুল হক বর্তমানে বিএনপির কোনো পদ-পদবিতে নেই। এরপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আগামী ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতারা এ ধরনের কর্মসূচিকে ‘অসাংগঠনিক ও অবৈধ’ দাবি করে বলেন, এর মাধ্যমে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ঘোষিত কর্মসূচি ভণ্ডুলের চেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে রেজওয়ানুল হককে বিএনপির নামে কোনো কর্মসূচি পালন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দলের কোনো নেতা-কর্মী তার ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিলে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বহিষ্কারের কথাও বলা হয়।
পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে তীব্র প্রতিবাদ
এদিকে একই দিনে পার্বতীপুর উপজেলা ও পৌর বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগী, নিবেদিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত নেতা-কর্মীদের একটি অংশ আহ্বায়ক কমিটির সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে।
তাদের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যে বলা হয়, পার্বতীপুর উপজেলা ও পৌর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সাজেদুর রহমান, আকরাম হোসেন ও এ.জেড.এম. রেজওয়ানুল হকের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে যারা দলের জন্য শ্রম, ত্যাগ ও নির্যাতন সহ্য করেছেন, তারা আহ্বায়ক কমিটির সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে হতবাক হয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে—তাদের ঘোষিত কর্মসূচির বাইরে অন্য কেউ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে পারবেন না। অন্যথায় বহিষ্কার করা হবে। এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বলেন, বিএনপির কমিটির সদস্যের চেয়ে দলের সমর্থকের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের মতো দলীয় কর্মসূচি নিয়ে এমন নিষেধাজ্ঞা সংগঠনের বিস্তার ও ঐক্যের জন্য ইতিবাচক নয়।
বক্তব্যে তারা এ.জেড.এম. রেজওয়ানুল হকের দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। তাদের দাবি, গত ৩৫ বছর ধরে তিনি দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে মামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তারা আরও দাবি করেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের অংশ হিসেবে পার্বতীপুরে তৎকালীন সরকারের নির্বাচন প্রতিহত করার বিভিন্ন কর্মসূচিতে রেজওয়ানুল হকের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা সক্রিয় ছিলেন। এ সময় বিপুলসংখ্যক মামলা ও আসামির ঘটনায় নেতা-কর্মীরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন বলে তারা উল্লেখ করেন।
২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তারা বলেন, পরাজয়ের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও রেজওয়ানুল হক নির্বাচনে অংশ নেন এবং প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। এটিকে তারা তার জনপ্রিয়তা ও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনেও জনগণের চাপের কারণে রেজওয়ানুল হক নির্বাচনে অংশ নেন এবং পার্বতীপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী তার পক্ষে অবস্থান নেন। পরে জনগণের ভোটে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বলেও তারা দাবি করেন।
পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নিয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করা এবং বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া সাংগঠনিক ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিএনপিকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার আশঙ্কা তৈরি করছে।
তারা পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির কার্যক্রম পুনঃতদন্ত করে দলের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে একই দিনে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে পার্বতীপুরের বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও নেতৃত্বের বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য জানা যায়নি।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: রুকুনুজ্জামান, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: ০১৫৫৬৩০৫০২৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত