সাকিব আহসান প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও : টানা বৃষ্টিতে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে। সকাল থেকে কখনো মুষলধারে, আবার কখনো থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল কমেছে। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা ও কাদাপানি। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ভ্যানচালক, রিকশাচালক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ। প্রতিদিনের আয় দিয়েই যাদের সংসারের চাকা ঘোরে, বৃষ্টির কারণে তাদের অনেকেরই কর্মঘণ্টা কমে গেছে, কারও আবার পুরো দিন কেটে যাচ্ছে আয়হীন অবস্থায়।
বৃষ্টির দিনে ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বের হওয়াটাও ভ্যানচালকদের জন্য হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টিতে যাত্রী কমে যাওয়ায় আয় কমছে, অথচ ভ্যানের দৈনিক খরচ, সংসারের বাজার ও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে।
পীরগঞ্জ পৌর শহরের এক ভ্যানচালক বলেন, “বৃষ্টি হলে মানুষ খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হয় না। সকাল থেকে ভ্যান নিয়ে বের হলেও যাত্রী পাওয়া যায় কম। কোনো দিন অর্ধেক দিনের আয়ও হয় না। কিন্তু ঘরে তো চাল-ডাল কিনতে হবে, ভ্যানের খরচও আছে।”
আরেক ভ্যানচালক জানান, বৃষ্টির মধ্যে ভ্যান চালাতে গিয়ে কাপড়-চোপড় ভিজে যায়। রাস্তার কাদা ও পানি পার হয়ে যাত্রী পরিবহন করতে গিয়ে ভ্যানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার ভাষায়, “বৃষ্টি আমাদের জন্য শুধু কষ্ট নয়, আয় বন্ধ হওয়ারও কারণ। রোদ থাকলে যতবার যাত্রী পাই, বৃষ্টিতে তার অর্ধেকও পাওয়া যায় না।”
শুধু ভ্যানচালক নন, বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন দিনমজুররা। নির্মাণকাজ, মাটি কাটা, কৃষিশ্রমসহ নানা ধরনের দৈনিক মজুরির কাজ অনেক সময় বৃষ্টির কারণে বন্ধ থাকে। ফলে কাজ না থাকলে মজুরি নেই এমন বাস্তবতায় তাদের সংসারে দেখা দেয় টানাপোড়েন।
এক দিনমজুর বলেন, “আমরা দিন আনি দিন খাই। সকালে কাজের আশায় বের হই। কিন্তু বৃষ্টি বেশি হলে ঠিকাদার বা মালিক কাজ বন্ধ করে দেন। সেদিন আর কোনো আয় থাকে না। ধার করে সংসার চালাতে হয়।”
আরেক শ্রমিকের ভাষ্য, “বৃষ্টির সময় ঘরে বসে থাকলে পেট তো আর বসে থাকে না। বাজারের দাম দিতে হয়, ছেলেমেয়েদের খরচ আছে। একদিন কাজ বন্ধ মানেই সংসারে একদিনের খাবারের হিসাব এলোমেলো হয়ে যাওয়া।”
টানা বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার এলাকাগুলোতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। রাস্তায় পানি ও কাদা জমে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
পীরগঞ্জ কলেজ বাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, “বৃষ্টির কারণে বাজারে মানুষের উপস্থিতি কমেছে। দোকানে ক্রেতা কম থাকায় ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ, কারণ তাদের আয় সরাসরি কাজের সঙ্গে যুক্ত।”
মাঠে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শ্রমিকেরা কাজ করতে পারছেন না। ফলে কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও আয় হারাচ্ছে।
জনজীবনের এই দুর্ভোগে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নিম্নআয়ের মানুষের অসহায়ত্ব। বৃষ্টি কারও কাছে স্বস্তির, কারও কাছে কৃষির জন্য আশীর্বাদ হলেও ভ্যানচালক ও দিনমজুরের কাছে অতিবৃষ্টি অনেক সময় কর্মহীনতার আরেক নাম।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: রুকুনুজ্জামান, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: ০১৫৫৬৩০৫০২৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত