"অতি ভক্তির লক্ষন ভালো নয়"
ইবনে শাহ
শ্রদ্ধা ভালোবাসার সীমা আছে, এই সীমা যখন কেউ অতিক্রম করে, তখন সেটা কখনোই মঙ্গলজনক হয় না। এ কারণে দেখা যায় হজ্জ কিংবা উমরার সময় মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বিভিন্ন ভাষার স্বেচ্ছাসেবক এবং মোয়াল্লেম দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁরা একটা বিষয় বারবার বুঝাতে চেষ্টা করেন যে--" আল্লাহ ও রাসুল দুইটি সত্তা, একজন স্রষ্টা আর একজন সৃষ্টি। আল্লাহর মর্যাদা ও স্থান শুধু আল্লাহর জন্য। তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে একই মর্যাদায় বা একই স্থানে আনো না। আল্লাহ সর্ব শ্রেষ্ঠ মর্যাদাবান ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসনের অধিকারী। রাসূল সঃ কে রাসুল সাঃ এর জায়গায় রাখো, রাসূল সঃকে কখনোই আল্লাহ সমকক্ষ বা আল্লাহর স্থানে জায়গা দিও না"। আমি আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করেছি বাংলা পাক ও ভারতীয় মুসলিমদের কে তারা এই বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি অবহিত করেছেন। তখন বুঝতে পারিনি ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য কেন এত স্বেচ্ছাসেবক।
আরবি ভাষার সাথে কম সম্পর্ক থাকার কারণে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষিত মানুষও আরবি সাহিত্যের অনেক রূপক কিংবা প্রবাদ বাক্যকে কোরআন বা হাদিস মনে করে। আরবি বর্ণমালা দেখলেই কোরআন ও হাদিসের কথা মনে পড়ে যায় এবং সেই ভাবেই আচরণ শুরু করে।
শুধু মনে করলে ভুল হবে তারা গুলোকে কোরআন ও হাদিসের মতই মূল্যায়ন করে, বিশ্বাস করে, প্রচার করে। কিন্তু কোরআন এবং হাদিস ছাড়াও যে আরবি সাহিত্যের ভান্ডার আছে, যেখানে গল্প উপন্যাস নাটক নাটিকা গদ্য পদ্য রোমান্টিক আধ্যাত্মিক প্রেমময় কাব্য আছে। সে সবও আরবি ভাষায় আরবি বর্ণমালায় লিখিত, এখানেই সমস্যা হয়েছে। আরবি ভাষা বা বর্ণমালায় কোন কিছু লেখা দেখলেই আমাদের এই উপমহাদেশের মুসলিমদের মনে অতি ভক্তি শুরু হয়ে যায়। কোনটি কোরআন হাদিস কিংবা আরবি সাহিত্য কাব্য গল্প উপন্যাস এটা বুঝার বা চিন্তা করার অবকাশ তারা পায় না। সাহিত্য গল্প উপন্যাস কিংবা নাটকের সংলাপ কে তারা কুরআন ও হাদিসের বাণী মনে করতে থাকে।
আমাদের দেশে রবিউল আউয়াল মাসে মিলাদ মাহফিল বা সিরাতুন্নবী সঃ এর আলোচনার ধুম পড়ে যায়। এ সকল মাহফিলে একটা কথা বারবার করে বক্তারা বলতেই থাকেন। আমাদের নবী সঃকে সৃষ্টি করা না হলে পৃথিবী সৃষ্টি করা হতো না, আমাদেরকেও সৃষ্টি করা হতো না। এই বক্তব্যের বিষয়ে কোরআন বা সহিহ হাদিসের কোন রেফারেন্স নেই। এ বিষয়ে আরবি বাক্য হলো--- "লাওলাকা লামা খালাকতুল আফলাক" যাহা আরবি অলংকারিক বা আধ্যাত্মিক সাহিত্যে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত একটি বাক্য। যার অর্থ-- “তুমি না হলে আমি আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করতাম না।”
যেহেতু কথাটি আরবি ভাষায় লিখিত এখানেই অতি ভক্তির কারণে কেউ কেউ মনে করে এটা হাদীস। তারা বলেন এর অর্থ: “হে মুহাম্মদ! আপনি না হলে আমি জগত সৃষ্টি করতাম না।”এই অর্থে বাক্যটিকে রাসূলুল্লাহ সঃ এর হাদীস হিসেবে উল্লেখ করে। বহু মুহাদ্দিস এটিকে জাল/বানোয়াট (মাওদূ‘) বলেছেন। যেমন ইমাম সাগানী, মোল্লা আলী কারী, ইবনু হাজার আসকালানী প্রমুখের বক্তব্য উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইসলামী আকীদার একটি অন্যতম বিষয় হলো মহান আল্লাহ রূহুর জগতে সকল রূহকে একত্রিত করে তার রুবুবিয়াতের স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন। এই ঘটনার কথা পবিত্র কুরআনের উল্লেখ করা আছে।
আল্লাহ বলেন:
“আর স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক আদমসন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষ্য গ্রহণ করলেন—‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।" (সূরা আল-আ‘রাফ, --১৭২ )
এই আয়াত থেকেই বোঝা যায় যে, রূহুর জগতে আদম সন্তানের যে সকল রূহু পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ নেবে তাদের সকলকে আল্লাহ তার কুদরতি ক্ষমতা বলে একত্রিত করে প্রশ্ন করেছেন—“আলাস্তু বি রব্বিকুম?”—“আমি কি তোমাদের রব নই?” এবং জবাব এসেছে—“বালা”—“অবশ্যই, আপনি আমাদের রব।” আমাদের নবী সঃ এর রুহু কি আদম সন্তানের রূহুর বাইরে আলাদা কোন সত্তা। কখনোই নয়, এ সম্পর্কে কুরআনে কোন দিক নির্দেশনা আসেনি। রাসূল সঃ এর মর্যাদা বোঝাতে আল্লাহতালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন --“রাসূলুল্লাহ সঃ সমগ্র জগতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন—এটি কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু ‘আপনি না হলে আমি পৃথিবী সৃষ্টি করতাম না’—এই বাক্যটি কুরআনের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আবার হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়।”
এ বিষয়ে ইমাম ইবনু তাইমিয়্যার বক্তব্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ----"শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—লোকমুখে যে বলা হয়, “আপনি না হলে আল্লাহ আরশ, কুরসি, আকাশ, পৃথিবী ইত্যাদি সৃষ্টি করতেন না”—এটি কি হাদিস? তিনি বলেন, --
“এটি নবী সঃ-এর কোনো হাদিস নয়—সহিহও নয়, দুর্বলও নয়। হাদিসের কোনো আলেম এটি নবী সঃ থেকে বর্ণনা করেননি... বরং এটি এমন একটি কথা যার বক্তা কে, তা জানা যায় না।”
তাহলে “আরবি সাহিত্যের অংশ” বলা যাবে কি?
হ্যাঁ, প্রচলিত আরবি আধ্যাত্মিক/সাহিত্যিক রচনায় বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন পরবর্তী সুফি ও আধ্যাত্মিক সাহিত্যে এটি উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু “আরবি সাহিত্যে প্রচলিত” আর “হাদিস”—দুটি এক জিনিস নয়"। ( মাজমূ‘ ফাতাওয়া--ইবনু তাইমিয়্যা , ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৬। )
যদি কেউ বলেন অতি ভক্তি করে করুক, তাতে সমস্যা কি? বাস্তব সমস্যা মনে না হলেও সুদূরপ্রসারী চিন্তা করলে অনেক সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। কারণ অতি ভক্তির কথা বর্ণনা করতে করতে রাছুল সঃ এর জীবনের আসল উদ্দেশ্য গুলো আর বলা হয় না। অতি ভক্তিতে কেউ কেউ অতি আসক্ত হয়ে নফলকে ফরজ মনে করে, আর কেউ কেউ ফরজকে নফলের কাতারে নিয়ে আসে। রাসুল সাঃ এর আদর্শ সমাজে প্রচার হয় না, বাস্তবায়ন হয় না। অতি ভক্তির জোরে জসনে জুলুস শুরু হয়ে যায়, সমাজ পরিচালিত হয় সেকুলার আদর্শে, পৌত্তলিক কৃষ্টি কালচারে ইসলামী সংস্কৃতি ঢাকা পড়ে যায়। আদল ও ইনসাফ থেকে মানুষ দূরে সরে গিয়ে জুলুমতন্ত্রের স্বীকার হয়। নবী সঃ এর আদর্শ ভূলুণ্ঠিত হয় সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, শ্রদ্ধা ভক্তি করতে করতেই জীবন শেষ হয়ে যায়।
কোরআন ও সুন্নাহ থেকে দূরে সরে গিয়ে গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করার কারণে ইসলাম বিরোধী শক্তি গুলো মুসলিম মিল্লাতের উপর জুলুম নির্যাতন করার সাহস পাচ্ছে। কারণ তুচ্ছ বিষয় কিংবা নফল বা মোস্তাহাব নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণে তাদের মাঝে দলাদলি ও মতবিরোধ এমনভাবে শুরু হয়ে যায় যে, সম্মিলিত ভাবে ইসলাম বিরোধী শক্তির মোকাবেলা করার মতো ফরজ কাজে শীসা ঢালা প্রাচীরের মত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। এভাবেই মুসলিম উম্মাহর পতনের যুগ শুরু হয়, যেখান থেকে আজও আমরা বেরিয়ে আসতে পারি নি।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: রুকুনুজ্জামান, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: ০১৫৫৬৩০৫০২৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত