কুড়িগ্রাম থেকে মোস্তাফিজুর রহমান : ০১ নভেম্বর ২০২৬, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় কুড়িগ্রাম জেলার ৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৭০ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
তবে মেধাবী হিসেবে ফুলবাড়ী উপজেলায় মাদ্রাসা থেকে আলিমে একমাত্র জিপিএ-৫ পেলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক উপজেলা সেক্রেটারি রবিউল আলম।
শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত ফলাফল তালিকা অনুযায়ী, শূন্য পাসের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী আদর্শ মহিলা কলেজ থেকে ২৪ জন, নাগেশ্বরী মডেল কলেজ থেকে ১৫ জন, রাজারহাটের সিঙ্গার ডাবরিরহাট কলেজ থেকে ১০ জন এবং সিঙ্গার ডাবরিরহাট বি.এল. হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৬ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। এ ছাড়া নাগেশ্বরীর কুটি পায়রাডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পাঁচজন, ছিলাখানা মডেল কলেজ থেকে চারজন, উলিপুরের হজরত ফাতেমা (রা.) পৌর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তিনজন, চিলমারীর দক্ষিণ খাউরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে দুজন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়।
অপরদিকে, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মিরের বাড়ি এলাকায় পাঙ্গারাণী লক্ষ্মী প্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ অবস্থিত। ঐতিহাসিক রাজারহাটের ওই পাঙ্গারাণী লক্ষ্মী প্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাত্র একজন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেও ফেল।
ফলাফলের তালিকায় দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এছাড়াও কুড়িগ্রাম জেলার সামগ্রিক ফলাফলও হতাশাজনক। এ বছর জেলায় ১১ হাজার ৭২২ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৪ হাজার ৭৭৩ জন। জেলায় গড় পাসের হার ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ।
তবে জেলায় ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার একটু বেশি। পাঁচ হাজার ৬৮৩ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ৩৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, ৬ হাজার ৩৯ জন ছাত্রীর পাসের হার ৪৫ দশমিক ২১ শতাংশ।
এ বছর জেলায় মোট ১৩৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৯ জন ছাত্র এবং ৭৭ জন ছাত্রী।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ৮ জেলার মধ্যে পাসের হারে কুড়িগ্রামের অবস্থান ষষ্ঠ।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন আটটি জেলা হলো: দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড়।
সাতটি কলেজ, তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজারহাটে একমাত্র জিপিএ-৫ পেলেন যমজ দুই বোন।
বাবার বেকারত্ব, সংসারের অভাব-অনটন আর নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার যমজ দুই বোন রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তাঁরাই একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনকারী।
রহিমা ও রাবেয়ার বাড়ি রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জি গ্রামে। তাঁরা রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে মেধাবী।
কলেজ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৪২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র দুজন—যমজ বোন রহিমা ও রাবেয়া। এ ছাড়া উপজেলার সাতটি কলেজ, তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তাঁরাই জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
অদম্য মেধাবী রহিমা ও রাবেয়ার অভাবের সংসারে পড়াশোনার লড়াই থামেনি। বাবা মনির হোসেন সরদার রিজু এবং মা নাসিমা বেগমের মূখ উজ্জ্বল করেছে অভাবের মাঝেও। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে পরিবারটির। বাবার বেকারত্বের কারণে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে মা-বাবাকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে।
তবে প্রতিকূলতা তাঁদের পড়াশোনার আগ্রহে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দুই বোনের শিক্ষাজীবনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ। প্রাইভেট শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল তাঁদের পড়াশোনায় সহায়তা করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তি, ফরম পূরণ ও বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। দুই বোন উপবৃত্তিও পেয়েছেন।
মা- নাসিমা বেগম বলেন, স্বামী বেকার থাকায় অনেক কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছেন তিনি। শিক্ষকদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানো, কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ও উপবৃত্তি তাঁদের মেয়েদের ভালো ফল অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সবার সহযোগিতা না পেলে এমন ফল করা কঠিন হতো বলেও মনে করেন মা নাসিমা বেগম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দুই বোনের
নিজেদের সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রহিমা ও রাবেয়া জানান, বাবার কষ্ট কিছুটা কমানো এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছেন। কলেজে যাতায়াত ও খাওয়াদাওয়ার সময় বাদে দিনের অধিকাংশ সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতেন তাঁরা।
এখন তাঁদের স্বপ্ন, ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। সেই লক্ষ্য পূরণে তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, রাজারহাট উপজেলার ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রহিমা ও রাবেয়া মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। তাঁদের এই সাফল্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ আনন্দিত। তিনি দুই বোনকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন ডিগ্রী কলেজের ফল প্রার্থী ২ জমজ বোনের জিপি এ ৫ লাভ। ১৪ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তারা ২ বোন এ প্লাস পেয়েছেন।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় সাইফুর রহমান ডিগ্রী কলেজে একমাত্র জিপিএ ৫ পেলেন জিতু। সে বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাবাশ গ্রামের জাহিদুল ইসলাম মেয়ে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ২০২৬ সালের আলিম পরীক্ষায় মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন মো. রবিউল আলম। তিনি উপজেলার শাহবাজার এ. এইচ. ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে তাঁর এ সাফল্যের বিষয়টি জানা যায়। রবিউল আলম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ফুলবাড়ী পূর্ব থানা শাখার সদ্য সাবেক সেক্রেটারি এবং সংগঠনটির একজন সাথী।
মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের আলিম পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ৮০ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৭৪ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৬ জন। পাসের হার ৪৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন একমাত্র রবিউল আলম।
ফুলবাড়ী উপজেলায় মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনের খবরে তাঁর সহপাঠী, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সংগঠনের সহকর্মীরা অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের সাফল্য কামনা করেছেন তাঁরা।
কুড়িগ্রামের রৌমারী কেরামতিয়া আদর্শ ফাযিল ডিগ্রি মাদরাসার আলিম পরীক্ষার ফলাফল মোট পরীক্ষার্থী ৫৭ জন। GPA-5 মোট ৩ জন সহ ৩৯ জন পাস। পাসের হার ৬৭:৪২%।
গোলাম হাবিব মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে চিলমারী উপজেলায় একমাত্র জিপিএ ফাইভ পেয়েছেন সুপ্তি মনি। তার বাবা জোড়গাছ বাজারের জনপ্রিয় ব্যবসায়ী এবং বিএনপি নেতা।
উলিপুরের পাঁচপীর কেরামতিয়া আলিম মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার ফলাফলে উদ্বেগজনক চিত্র! ২০২৬ সালের আলিম পরীক্ষায় ৬৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৭ জন। পাসের হার ১০.৯৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ শূন্য।
সচেতন মহলের প্রশ্ন: এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাগ্যে কি হবে?
ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রাম সরকারী স্কুলের সাবেক গুনি শিক্ষক বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সিদ্দিকী বলেন, তারা সাধারণ মাধ্যমিক শাখার কার্যক্রম দেখভাল করেন। উচ্চমাধ্যমিক শাখা সরাসরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ফলের বিষয়ে তারা বিস্তারিত অবগত নন।
এখানে উল্লেখ্য যে, লালমনিরহাট জেলার ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: রুকুনুজ্জামান, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: ০১৫৫৬৩০৫০২৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত