

বেরোবি প্রতিনিধি, মোঃ আল আমিন : রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। পৃথক সংবাদ সম্মেলনে উভয় সংগঠন প্রশাসনিক অনিয়মসহ একাধিক অভিযোগ উত্থাপন করে।
রবিবার (২৫ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে শিবির সমর্থিত শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তারা উপাচার্য প্রফেসর ড. শওকাত আলীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের দাবি, উপাচার্যের কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে উপাচার্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সকাল সাড়ে ১১টায় একই স্থানে সংবাদ সম্মেলন করে বেরোবি ছাত্রদল। তারা রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দায়িত্ব পালন ও বিভিন্ন ইস্যুতে অনিয়মের অভিযোগ করেন। ছাত্রদলের নেতারা বলেন, রেজিস্ট্রারের ভূমিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করছে।
পরপর দুটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভিসি ও রেজিস্ট্রার ইস্যুতে বেরোবি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র সংসদ প্রসঙ্গে উপাচার্যের অনগ্রসরতার অভিযোগ তুলে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শিবির নেতা মেহেদি হাসান বলেন, উপাচার্য একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করেছেন। তিনি কৌশলগতভাবে সময় ক্ষেপণ করে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্র সংসদ নির্বাচন এড়িয়ে গেছেন। দীর্ঘ আন্দোলনের পরও ছাত্র সংসদ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ করে তিনি বলেন, পূর্ববর্তী উপাচার্যের সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অনৈতিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব বিষয়ে দুদকের মামলা ও তদন্ত চলমান রয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন। এছাড়া গুচ্ছ পদ্ধতির বাইরে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বেরোবি থেকে যে আয় হয়, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে যুক্ত করা হয় না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
শহীদ আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তারা বলেন, বর্তমান উপাচার্যের প্রধান দায়িত্ব ছিল অতীত প্রশাসনের অনিয়ম ও অন্যায়ের বিচার করা, কিন্তু তিনি সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। বাজেট আত্মসাৎ ও অনৈতিক নিয়োগ তদন্তে একাধিক কমিটি হলেও দৃশ্যমান কোনো ফল পাওয়া যায়নি । এসব অনিয়ম আড়াল করতে উপাচার্য একটি বিশেষ মহলের ওপর নির্ভর করছেন দাবি করে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
অন্যদিকে উপাচার্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বেরোবি শাখা ছাত্রদল বলেন রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দায়িত্ব পালন ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তোলে। ছাত্রদলের সহ-সভাপতি তুহিন বলেন, অবৈধ রেজিস্ট্রার কর্তৃক ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টি এবং উপাচার্যের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, রেজিস্ট্রার অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন এবং একটি গুপ্ত গোষ্ঠীর সহায়তায় উসকানিমূলক ও দলীয় প্রচারণায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আবু সাঈদ হত্যা মামলার প্রসঙ্গে তুহিন আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দায়ের করা মামলায় সহযোগিতার পরিবর্তে রেজিস্ট্রার অসহযোগিতা করেছেন, যার ফলে আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
এছাড়া রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে একটি গুপ্ত গোষ্ঠী এবং তাদের ছাত্রী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যেকোনো তদন্ত কমিটিতে উনি মন মতো তদন্ত রিপোর্ট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারসাম্য নষ্ট করেন। ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, রেজিস্ট্রারের গাফিলতির কারণেই এখনো ভোটার তালিকা সংশোধন হয়নি।
ছাত্রদল দাবি করে, উপাচার্যের হাত ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। আবু সাঈদ গেট, রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু রেজিস্ট্রার ও একটি গুপ্ত গোষ্ঠীর অসহযোগিতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শওকত আলী বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত একবারই রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল ২০১৪ সালে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি জানান, ওই সময় দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে বিভিন্ন পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
ব্রাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, আমি যদি আমার মনের কথা খুলে দেখাতে পারতাম, তাহলে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বলতে পারত না যে আমি ব্রাকসু নির্বাচন চাই না। তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেছেন, তাদের কাছে তারা কেন যাননি—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।তিনি আরও বলেন, ভাইস চ্যান্সেলর কখনোই নির্বাচন কমিশনের প্রধান হতে পারেন না।
উপাচার্য আরও বলেন, ইউজিসি থেকে প্রয়োজনীয় আইন পাস করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে এবং সেই আইন অনুযায়ীই নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হবে।