
মোঃ মুঈদ চৌধুরী, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুটি ও সয়ার ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনেশ্বরী নদী-এর চিলাপাক কালুরঘাটে একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েক হাজার মানুষকে নদী পারাপার হতে হচ্ছে।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিলাপাক-কালুরঘাট দীর্ঘদিন ধরে এলাকার একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে খেয়াঘাটের ওপর নির্ভর করেই তাদের চলাচল করতে হচ্ছে।
শুকনো মৌসুমে গ্রামবাসীরা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে নদী পার হন। কিন্তু বর্ষা এলেই সেই সাঁকো পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন বাধ্য হয়ে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে নদীর পানি বেড়ে গেলে ও স্রোত তীব্র হলে মাঝিরা অনেক সময় পারাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। এতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জরুরি প্রয়োজনে রাতের সময় নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুমে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও নৌকা পাওয়া যায় না। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে।
সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধান, আলু, ভুট্টা ও বিভিন্ন শাকসবজি সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হয়ে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে, যা কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট বাড়াচ্ছে।
এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নদী পার হয়ে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যেতে হয়। বর্ষায় ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের পাঠাতে চান না, ফলে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।
কুর্শা ইউনিয়নে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মতিনুজামান বলেন, নদীর ওপারে বসবাসকারীদের চলাচলে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ঘাট যেন এক দুঃস্বপ্ন। হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা শহরে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ায় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে যায়।
চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারা এবং পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।
হাড়িয়ারকুটি ও সয়ার ইউনিয়নের চিলাপাক, পাটানি পাড়া, দোলাপাড়া, বানিয়াপাড়া, উজিয়াল, মামুনপাড়া, মেনানগর, কালুরঘাট, ডাঙ্গাপাড়া, প্রামানিক পাড়া, মন্ডলপাড়া, মাসুয়াপাড়াসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ সরাসরি এই ঘাটের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে একাধিক জনপ্রতিনিধি সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। হাড়িয়ারকুটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুমারেশ রায় এবং সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল ইবাদাত হোসেন পাইলট জানান, বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা সমন্বয় সভায় উত্থাপন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এলাকাবাসীর জোর দাবি, কালুরঘাটে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগই কমবে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।