
বেরোবি প্রতিনিধিঃ ফুটবল যদি একটা ক্যানভাস হয়, তবে সেখানে আঁকা সবচেয়ে সুন্দর এবং নিখুঁত ছবিটার নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। কোনো এক জাদুকরের তুলির টানে যেমন অসম্ভব সব দৃশ্য জীবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনি সবুজ ঘাসের ওপর বল পায়ে মেসির প্রতিটি পদক্ষেপ ফুটবলপ্রেমীদের মনে করিয়ে দেয়—ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি এক চরম নান্দনিক শিল্প। রোজারিওর এক চিলতে গলি থেকে শুরু করে দোহার লুসাইল স্টেডিয়ামের বিশ্বজয়ের মঞ্চ; মেসির এই দীর্ঘ পথচলা আসলে কোনো সাধারণ গল্প নয়, এটি ত্যাগের, আবেগের এবং ফুটবলের এক অমর মহাকাব্য।
হরমোনের লড়াই এবং একটি ন্যাপকিন পেপারের চুক্তি
গল্পটার শুরু আর্জেন্টিনার এক সাধারণ শিল্পাঞ্চল রোজারিওতে। ১৯৮৭ সালের জুনে জন্ম নেওয়া এক শীর্ণকায় বালক, যার পায়ের জাদু তখনই স্থানীয়দের চোখ কপালে তুলে দিত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মাত্র ১০ বছর বয়সে ধরা পড়ল ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ বা হরমোনজনিত সমস্যা। প্রতি রাতে নিজের পায়ে ইনজেকশন ফুটিয়ে বড় হওয়ার লড়াই চালাতে হতো ছোট্ট লিওকে। চিকিৎসার খরচ জোগাতে যখন আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলো পিছু হটল, তখন দেবদূতের মতো এগিয়ে এলো বার্সেলোনা।
বার্সার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লোস রেক্সাচ মেসির খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, হাতের কাছে কোনো কাগজ না পেয়ে একটা সাধারণ ন্যাপকিন পেপারেই চুক্তি সই করে ফেলেছিলেন। সেই একটা টুকরো কাগজ যে কেবল বার্সেলোনার নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের ইতিহাস নতুন করে লিখবে, তা কে জানত! জন্মভূমি ছেড়ে, চেনা পরিবেশ ছেড়ে ১৩ বছরের এক বালক পাড়ি জমালো স্পেনে। লা মাসিয়ার একাডেমিতে শুরু হলো এক নতুন রাজপুত্রের গড়ে ওঠার গল্প।
ন্যু ক্যাম্পের রাজত্ব এবং বার্সার সোনালী অধ্যায়
২০০৪ সালে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেকের পর থেকে মেসি যা করেছেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। রোনালদিনহোর কাছ থেকে পাওয়া ১০ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়ে মেসি ন্যু ক্যাম্পকে বানিয়েছিলেন নিজের কল্পরাজ্য। টিকিটাকা ফুটবলের স্বর্ণযুগে জাভি, ইনিয়েস্তাদের সাথে মিলে মেসি যে আক্রমণভাগ গড়ে তুলেছিলেন, তা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য ছিল এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন।
বার্সেলোনার হয়ে ১০টি লা লিগা, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং অসংখ্য ট্রফি জিতেছেন তিনি। রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর জিতে নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো বাকিদের জন্য কেবলই এক দূর আকাশের স্বপ্ন। কিন্তু এতসব ক্লাব সাফল্যের মাঝেও মেসির মনের এক কোণে সারাক্ষণ একটা ক্ষত তাজা ছিল—আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সি।
নীল-সাদা ট্র্যাজেডি এবং ফিনিক্স পাখির মতো প্রত্যাবর্তন
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক শিরোপা না পাওয়া। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে ট্রফির পাশ দিয়ে মেসির হেঁটে যাওয়ার সেই দৃশ্যটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক মুহূর্ত। এরপর পর পর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার। বুকভাঙ্গা কান্না আর সমালোচকদের তীব্র বাণে জর্জরিত হয়ে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছিলেন।
কিন্তু মহাকাব্যের নায়কেরা তো এভাবে বিদায় নিতে পারেন না। কোটি ভক্তের ভালোবাসা আর দেশের টানে আবারও ফিরলেন। আর এই ফিরে আসাই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর পুনরুত্থান। ২০২১ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় ছিল মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি। এরপর যেন সব বাঁধা এক নিমেষে কেটে গেল।
লুসাইলের অমরত্ব: বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার গল্প
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে যেন ইতিহাসের চাকা এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে মেসির সামনে সুযোগ ছিল নিজেকে পেলে বা ম্যারাডোনার সমকক্ষে নিয়ে যাওয়ার, কিংবা তাদেরও ছাড়িয়ে যাওয়ার। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল ছিল ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ম্যাচগুলোর একটি।
এমবাপের দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকও সেদিন মেসির ভাগ্যকে বদলে দিতে পারেনি। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়ের সাথে সাথেই যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেমে গিয়েছিল। ডিয়েগো ম্যারাডোনার পর দীর্ঘ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনার হাতে বিশ্বকাপ। সেই রাতে ট্রফি হাতে মেসির মুখে যে চওড়া হাসি দেখা গিয়েছিল, তা ছিল এক পরম প্রাপ্তির, এক আজন্ম সাধনার পূর্ণতার হাসি। ফুটবল অবশেষে তার রাজাকে তার প্রাপ্য মুকুটটি ফিরিয়ে দিয়েছিল।
ফুটবল ছাড়িয়ে এক অনন্য চরিত্র
পিএসজি ঘুরে মেসি এখন খেলছেন আমেরিকার ইন্টার মায়ামিতে। ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে এসেও তাঁর পায়ের জাদু কমেনি বিন্দুমাত্র। তবে মেসি কেবল মাঠের জাদুকর নন, মাঠের বাইরেও তিনি এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। অহংকারহীন জীবনযাপন, পরিবারের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং বিনয়ী স্বভাব তাঁকে বিশ্বের কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর রোল মডেলে পরিণত করেছে।
ফুটবলে গতি আছে, শক্তি আছে, কৌশল আছে। কিন্তু মেসির খেলায় যা আছে, তা হলো বিশুদ্ধ আনন্দ। তিনি যখন তিনজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিং করে কাটিয়ে বল জালে জড়ান, তখন মনে হয় সময় যেন থমকে গেছে। বয়স বাড়ছে, হয়তো আর কয়েক বছর পর বুটজোড়া তুলে রাখবেন এই কিংবদন্তি। কিন্তু ফুটবল যতদিন থাকবে, সবুজ মাঠ যতদিন থাকবে, রোজারিওর সেই ছোট ছেলেটির গল্প রূপকথা হয়ে বেঁচে থাকবে প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে। লিওনেল মেসি—যিনি ফুটবলকে কেবল শাসন করেননি, ফুটবলকে ভালোবেসেছেন এবং আমাদেরও ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।