
জাহিদ হাসান, রাজারহাট উপজেলা প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্রটি’ ছয় বছরেও চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে থাকায় ভেতরে থাকা কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হতে বসেছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ যেমন ভেস্তে যেতে বসেছে, তেমনি সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘কুড়িগ্রাম ও জামালপুর জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ’ প্রকল্পের আওতায় বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) ২০১৮ সালের ১ জুলাই প্রকল্পটির কাজ শুরু করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেম্বারে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে তাঁদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজারহাটের এই কেন্দ্রে ধান, গম ও সরিষা ভাঙানোর পাশাপাশি মসলা, চিপস ও বেকারি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা রাখা হয়। এছাড়া দুধ, মাছ ও মাংস সংরক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয় আধুনিক কোল্ড চেম্বার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে নির্মাণকাজ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরডিএ-র কাছে কেন্দ্রটি হস্তান্তর করে। তবে হস্তান্তরের এতদিন পার হলেও কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ যুগ্ন আহবায়ক রাজারহাট উপজেলা শাখা (NCP) জনাব ডাঃ এম. এ মোনাইম খাঁ (মোন্নাফ) বলেন, কৃষকদের সুবিধার জন্য এত বড় একটি কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এটি বন্ধ। ভেতরে দামি মেশিনপত্র পড়ে আছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে এসব মেশিন নষ্ট হবে তাতে সন্দেহ নেই। দ্রুত এটি চালু করে কৃষকদের কাজে লাগানো দরকার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক তালাবদ্ধ। ভেতরে সুনসান নিরবতা। পাহারাদার থাকার কথা থাকলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। ভেতরে সারি সারি দামি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ফেলে রাখায় সেগুলো জং ধরে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, কেন্দ্রটি চালু হলে তাঁদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পাওয়া সহজ হতো এবং পচনশীল দ্রব্যাদি সহজে সংরক্ষণ করা যেত। কিন্তু বর্তমানে কোনো সুফল না পাওয়ায় তাঁদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কেন্দ্রটি চালু না হওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার ছবি ফুটে উঠেছে। উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা এস এম শওকত আলম জানান, এটি তাঁদের মন্ত্রণালয়ের হলেও প্রকল্প সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত কিছু জানা নেই। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সভাপতি তানজিলা তাসনিম বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
তবে রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) পরিচালক জাহেদুল হক চৌধুরী জানান, “আগের নীতিমালা অনুযায়ী আরডিএ-র নিজস্ব জনবল দিয়ে এটি পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তীব্র জনবল সংকটের কারণে কেন্দ্রটি চালু করা যায়নি। বর্তমানে নীতিমালা পরিবর্তন করে টেন্ডারের মাধ্যমে সমবায় সমিতি, এনজিও বা আগ্রহী উদ্যোক্তার কাছে তিন বছরের জন্য লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।” তবে এটি কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দ্রুত নিরসন করে কেন্দ্রটি চালু করা না হলে সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।