
গন্ধটা অনেক ভেতর থেকে আসতেছে,, যে কারণে যতই আতর গোলাপ ছিটানো হোক না কেন কিছুদিন পর পর দুর্গন্ধ বের হতেই থাকে। সাধারণ মানুষ ওই দুর্গন্ধের হদিস খুঁজে পায় না । কারণ এ গন্ধটার মূল উৎস হলো শিক্ষা ব্যবস্থায়।
ইসলামী খেলাফতের ইতিহাসে মুসলিমদের জন্য কখনো ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। ইউরোপীয়রা অনেক ষড়যন্ত্র করে মুসলিমদের শিক্ষা ব্যবস্থা জেনারেল শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা নামে বিভক্ত করে। এরি ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ও আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হওয়ার কারণে, আকাবিরে ছিত্তা কর্তৃক মুসলিম মিল্লাতের শিক্ষার জন্য অন্য একটি ধারা চালু করা হয় দারুল উলুম দেওবন্দে। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার আকাবিরীগণ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দ্বীন ইসলামের মুজাহিদ তৈরি হবে, যাঁদের নেতৃত্বে ভারতীয় উপমহাদেশ ইসলামী খেলাফত পূনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করবে। কিন্তু আকাবিরে ছিত্তার ইন্তেকালের পর দারুল উলুম দেওবন্দের স্থলাভিষিক্ত আকাবীরগণ ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ইসলামী খেলাফতের বিরোধী শক্তির সাথে জোটবদ্ধ হয়। জোটবদ্ধ বললে ভুল হবে তারা ইসলামী খেলাফত বিরোধী শক্তির অনুসারী বা সঙ্গী সাথী হয়ে যায়। যা অদ্যবধি অটুট আছে, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে ।
এর কারণ কি? এর প্রকৃত কারণ হলো ইজ্জতের চেয়ে রুটির মূল্যকে বেশি মনে করা। খোলাখুলি বলতে গেলে এক কথায় বলতে হবে– গণিত বা অংক ছাড়া যেমন কোন শিক্ষা সফল হয় না, তেমনি ইসলামী শিক্ষা সফলতার জন্য চারটি বিষয় অপরিহার্য । সেই অপরিহার্য চারটি বিষয় হলো–
১। রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ সঃ এর জীবনচরিত
২। রাসূলুল্লাহর সাহাবীগণের জীবনচরিত
৩। ইসলামী খেলাফত
৪। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা
কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহ সঃ এর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ এবং রাসুলুল্লাহ সঃ বলেছেন সাহাবায়ে কেরাম উজ্জ্বল নক্ষত্র। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সঃ এবং সাহাবায়ে আজমাইন আমাদের জন্য একমাত্র অনুসরণীয় অনুকরণীয় আদর্শ। প্রতিটি মুসলিমের ব্যক্তিগত সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক জীবন ধারায় আল্লাহর রাসূল সঃ এর জীবন ধারাকে অনুসরণ করা ফরজ। সাহাবায়ে কেরামের জীবন দর্শন আলোকবর্তিকা।
রাসুল সঃ মদিনায় ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছেন, চারজন প্রধান সাহাবী ইসলামী খেলাফত পরিচালনা করেছেন। ইসলামী খেলাফতের জন্য তদানীন্তন বিশ্বের সকল অর্থ ব্যবস্থা কে বাতিল করে নতুন নিয়মে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। রাসুল সঃ ও সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী সময়েও খেলাফতে রাশেদা অনুসরণে হাজার বছরের বেশি সময় ধরে তিন মহাদেশব্যাপী ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু রাসূল সঃ এর জীবনী, সাহাবীদের জীবনী, ইসলামী খেলাফত, ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে আমরা কোন লেখাপড়া করিনি। এ সকল বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়নি, কোন সাবজেক্ট ছিল না, পরীক্ষা হয়নি ।
তাহলে আমরা এ সকল বিষয়ে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি যে নিজের জীবনের সাথে এ সকল বিষয়কে মিলিয়ে নেব। সম্ভবত এই কারণে আমাদের দেশে তথাকথিত ওলামায়ে কেরামের বেশিরভাগই। পুজিবিহীন ব্যবসা পীরতন্ত্রের সাথে জড়িত। কেউ নিজে পীর সেজে খানকা খুলে বসে আছে, কেউবা প্রধান খলিফার দাবী করছে, অন্যরা মুরীদ হয়ে ঘোরাফেরা করছে খেলাফত প্রাপ্তির আশায়। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈনগণ পীর তন্ত্র নামক পুজিবিহীন ব্যবসা করেননি, একথা এদেশে বলতে গেলে অনেক বড় অন্যায় হয়ে যায়। কারণ মূর্খতার মাঝে পীরতন্ত্রের ব্যবসা বেশ ভালোই জমে।
দুঃখের বিষয় হলো শতকরা ৯০ জন মুসলিমের দেশ অর্থাৎ দারুল ইসলাম হওয়ার পরও এদেশের আলিয়া, কওমি কিংবা জেনারেল কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ৪টি বিষয়ে আলাদা কোন সাবজেক্ট নেই। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসূল সঃ এর জীবনী, সাহাবীদের জীবনী, ইসলামী খেলাফত, ইসলামী অর্থনীতি এই চারটি সাবজেক্ট রাখা হয়নি, যাতে এদেশের মুসলিমরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা না পায়। কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত মোট ২৬ জন প্রিন্সিপাল ছিল খ্রিস্টান পাদ্রী, খ্রিস্টান পাদ্রী উপমহাদেশের আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা নীতি ও সিলেবাস প্রণয়ন করেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন। সঙ্গত কারণেই উল্লিখিত চারটি বিষয় শিক্ষাকারিকুলাম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী শিক্ষা থেকে মুসলিম মিল্লাতকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য স্কুল কলেজ নামে আলাদা প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। বাকি থাকে কওমি মাদ্রাসা। হিন্দু রাষ্ট্র ভারতে (দারুল হরব) টিকে থাকার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবিরগণ তাদের সকল জা’মিয়ায় উল্লেখিত ৪টি বিষয় আলাদা সাবজেক্ট হিসেবে পড়ানোর অনুমতি পান না। উল্লিখিত চারটি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের কোন কারিকুলাম দারুল উলুম দেওবন্দে নেই। এ কারণে আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসায় উল্লিখিত চারটি বিষয়ে আলাদা কোন কারিকুলাম নেই, উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের ব্যবস্থা নেই। একেবারেই পড়ানো হয় না সেটা নয় বিভিন্ন বিষয়ের কিতাব অধ্যায়ন করতে গিয়ে উল্লিখিত চারটি বিষয় সম্পর্কে প্রাসঙ্গিকভাবে যেটুকু আলোচনায় আসে তাই। অর্থাৎ আমাদের দেশে দাঁতের ডাক্তারগণ হৃদরোগ সম্পর্কে যেমন অভিজ্ঞ তেমনি। কিংবা ফিজিক্স কেমিস্ট্রি তে উচ্চতর ডিগ্রিধারী কোন ছাত্র যতোটুকু ভূগোল বা ইতিহাস জানে তেমনি ভাষা ভাষা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়।
আমার কথা বিশ্বাস না হলে আমাদের দেশের মাদ্রাসা বোর্ডের শিক্ষা কারিকুলাম, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থার খোঁজ নিন। দেখবেন সত্যি সত্যি আলিয়া বা কওমি মাদ্রাসায় উল্লেখিত চারটি বিষয়ে আলাদা কোন সাবজেক্ট নেই, কিতাব নেই কিংবা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের কোন ব্যবস্থা নেই। আমাদের দেশে বড় বড় আলেমরা উল্লেখিত চারটি বিষয়ে পিএইচডি / উচ্চতর গবেষণা করেন না। এদেশের বড় বড় আলেমগণ প্রাথমিক শিক্ষা, পশুপালন, সমবায় সমিতি, পরিবার পরিকল্পনা এমন বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। খোঁজ নিয়ে দেখুন আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসার কোন আকাবির সিরাতুন্নবী সঃ, সাহাবীদের জীবনী, ইসলামী অর্থনীতি কিংবা ইসলামী খেলাফত নিয়ে কেউ দাওরা পাস করেন না, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন না। কারণ উনাদের আকবিরওস্তাদগণ উল্লিখিত চারটি বিষয়ে শিক্ষা দেন নাই। আলিয়া মাদ্রাসা হলে কলকাতা আলিয়ার খ্রিস্টান পাদ্রীগন উনাদের শিক্ষকবৃন্দকে শিক্ষা দেয় নাই। তাহলে এদেশে দ্বীন ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা আসবে কোথা থেকে? এ কারণে এ দেশের জেনারেল শিক্ষিত থেকে শুরু করে আলেম-ওলামা সকলেই দ্বীন ইসলামের মৌলিক চারটি বিষয় খুবই স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী। এ কারণেই দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে কিংবা ইকামতে দ্বীন সম্পর্কে আমাদের দেশে মাঝে মাঝে বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা শোনা যায়।
বিংশ শতকের একজন ইসলামী লেখক চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ সর্বপ্রথম উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন । তিনি হলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী (রহীঃ)। তিনি উল্লেখিত চারটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রচুর পড়াশোনা করে লেখালেখি শুরু করেন। ইসলামী জীবন ব্যবস্থার বিভিন্ন শাখার উপর অনেক পুস্তক রচনা করেন, যা সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের নিকট সমাদৃত হয়েছে। এদেশের স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষালাভ করা কোটি কোটি মুসলিম তার লিখিত বিভিন্ন বই পড়ে দ্বীন ইসলামের সঠিক জ্ঞান লাভ করেছেন। যাঁরা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করার পরও উল্লেখিত চারটি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেনি, তারা অংক ছাড়া পন্ডিত। ইসলামী জীবন বিধান সম্পর্কে উনাদের জ্ঞান এতই নগণ্য যে এদের কাছ থেকে দ্বীন ইসলাম বা দ্বীন কায়েমের সঠিক তথ্য কোনদিনই আশা করা যায় না। কলেমা নামাজ রোজা হজ জাকাত হালাল হারাম পাক পবিত্র ছাড়া দ্বীন ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে এদের কোন পড়াশোনা নেই।
এ কারণে ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব, ইসলাম ও জাহিলিয়াত, ইসলামী খেলাফতের ক্রমবিন্যাস, মধ্যযুগের ইসলামী সোনালী দিনের অবদান, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা, রাসুলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন, সাহাবায়ে কেরামের ইসলামী খেলাফতের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন এ সব বিষয়ে কোন কিছুই জানে না। ইসলামী তাহজীব তামাদ্দুন কি, ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা, ইসলামী নেতৃত্ব, ইসলামী আদর্শ কিভাবে বিকশিত হবে এ সকল বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের কোন সুযোগ পায়নি।
এ কারণে ইকামতে দ্বীনের অর্থ বিকৃতি করা হয়েছে এ কথাটা যত সহজে বলতেছেন, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা, ইসলামী আইন আদালত কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, কে করবে, কার দায়িত্বে প্রতিষ্ঠা হবে, পরিচালিত হবে এ সম্পর্কে কোন কথা বলতে পারে না। তাদের মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার ফেকাবীদ / ইসলামী আইনোজ্ঞ পাস করে বের হয়ে মসজিদ মাদ্রাসায় খেদমত করে, তারা কোনদিন আইন আদালতে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস করে না। এর একমাত্র কারণ ইকামতে দ্বীন সম্পর্কে তাদের সঠিক ধারণা নেই। ইসলামী খেলাফত কি তারা জানেনা, খেলাফতের অন্যতম দায়িত্ব সম্পর্কে আজও এরা অজ্ঞ। অন্ধ ব্যক্তি কাউকে যেমন পথ দেখাতে পারেনা তেমনি ওরা কাউকে সঠিক পথ দেখাতে পারেনা। এদেশের দরবারী আলেমদের কথায় একামতে দ্বীনের কর্মীদের কোন কিছু আসে যায় না। এদের কথায় কান দিয়ে সময় নষ্ট করার মত সময় ইকামতে দ্বীনের কর্মীদের নেই। মূর্খতার জবাব মূর্খতা দিয়ে নয়, মূর্খতার জবাব জ্ঞানের আলোকেই দিতে হবে। যখন এই সকল মাদ্রাসায় দ্বীন ইসলামের মৌলিক চারটি বিষয় সম্পর্কে আলাদা সাবজেক্ট, আলাদা কিতাব থাকবে, আর উল্লিখিত বিষয় সমূহে উচ্চতার ডিগ্রী অর্জনের সুযোগ পেলে জাতি ভালো কিছু আশা করতে পারে। এ সময়টুকু আমাদেরকে ধৈর্যের সাথে অপেক্ষায় করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে–” তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন”